49
Sharesসিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে হত্যার আলোচিত রায়হান মামলার প্রধান আসামি পুলিশের উপপরিদর্শক আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় অপর দুই আসামিকে যাবজ্জীবন ও তিন জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এই রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় ছয় আসামির মধ্যে পুলিশের সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী উপস্থিত ছিলেন। বাকি পাঁচ আসামিই পালাতক। এর মধ্যে মামলার প্রধান আসামি আকবর গত ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। পরদিন ১১ আগস্ট তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আদালত ছয় আসামির মধ্যে আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। অন্য পাঁচ আসামির মধ্যে কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ, টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশের এসআই মো. হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী ও সাংবাদিক আব্দুল আল মামুনকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।’
মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট মুমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট। তবে আরো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।’
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে রায়হানকে সিলেট নগরের কাষ্টঘর এলাকা থেকে রায়হানকে তুলে নিয়ে কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরদিন সকালে তিনি মারা যান। নির্যাতনের সময় এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল ফোন থেকে রায়হানের পরিবারের কাছে কল করে টাকা চাওয়া হয়। পরদিন রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখের তত্ত্বাবধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি তদন্ত করে পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়।
এ ঘটনায় ১২ অক্টোবর ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রধান অভিযুক্ত এসআই আকবর পালিয়ে যান। ১৩ অক্টোবর মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ৮ নভেম্বর রাতে ভারতের দনা বস্তির খাসিয়া নৃগোষ্ঠীর লোকজন ভারতের অভ্যন্তর থেকে আকবরকে আটক করে। পরদিন ৯ নভেম্বর তাঁকে কানাইঘাট সীমান্তবর্তী দনা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের হাতে তুলে দেয় খাসিয়ারা। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে।
২০২১ সালের ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেন আদালতে এক হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। যে ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়, তাঁদের পাঁচজনই পুলিশ সদস্য। তাঁরা হলেন এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুনুর রশিদ। অভিযুক্ত অন্যজন আবদুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে ঘটনার পর ভিডিও ফুটেজ গায়েব করার অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান প্রধান আসামি আকবর। পরদিন ১১ আগস্ট তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান
রায়ে সন্তুষ্ট হলেও আসামি পালিয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ রায়হানের মা: পুলিশী নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত পুলিশ এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ডসহ ২জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৩ জনের ৭ বছরের কারাদণ্ডে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রায়হানের মা সালমা বেগম। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন তিনি।
পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেন ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করলে আমরা শান্তি পাব। রায়হানের আত্মাও শান্তি পাবে।’
আসামীদের পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে রায় ঘোষণার আগেই হতাশা প্রকাশ করেছিলেন সালমা বেগম। তিনি বললেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার থাকতে একজনেরও জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম তিনজন আসামি জামিন পায়? জামিন পেয়ে কীভাবে তারা পালিয়ে যায়? আজকে তো শুধু কাগজে কলমে রায় হবে। আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে আমার ছয় বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেল।’
ওয়াইএফ/০২