156
Sharesগোপালগঞ্জ সদরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তাররা হলেন, রাকিব মিয়া ওরফে ইমন (২২), পিয়াস ফকির (২৬), প্রদীপ বিশ্বাস (২৪), নাহিদ রায়হান (২৪), মো. হেলাল (২৪), তূর্য মোহন্ত (২৬)।
র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৮ শুক্রবার গোপালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে। র্যাব বলছে, ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণ করা হয়। জড়িতরা পেশাদার অপরাধী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে জড়িত থাকায় একাধিক মামলা রয়েছে।
তবে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। শনিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান, র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, সম্প্রতি গোপালগঞ্জের স্থানীয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ন্যক্কারজনকভাবে গণধর্ষণের শিকার হন।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ভুক্তভোগীসহ দুই শিক্ষার্থী গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ হেলিপ্যাডের সামনে থেকে হেঁটে মেসে যাওয়ার সময় কতিপয় দুর্বৃত্ত নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে ভিকটিমকে জোরপূর্বক স্থানীয় একটি ভবনে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে।
সারাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের যৌক্তিক আন্দোলনে ওই পৈশাচিক ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ জানায়। এঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে গোপালগঞ্জ সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত এঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র্যাব গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তাররা র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা গণধর্ষণের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছে, মূলত রাকিবের নেতৃত্বে স্থানীয় একটি অপরাধ চক্রের সদস্য। তারা সকলেই গোপালগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।
গ্রেপ্তার তূর্য মোহন্ত ব্যতীত তারা প্রায় ৮/১০ বছর যাবত নবীনবাগ এলাকায় বিভিন্ন স্থানে মাদক সেবন, আড্ডা, জুয়াসহ বিভিন্ন ধরণের অপকর্মে লিপ্ত ছিল। এছাড়াও তারা চুরি ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধেও জড়িত ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে রাস্তাঘাটে স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতো জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলাও রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গ্রেপ্তাররা ইজিবাইক দিয়ে নবীনবাগ হেলিপ্যাড সংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার পথে ভুক্তভোগীকে তার বন্ধুসহ দেখে ইজিবাইক থামিয়ে তাদেরকে নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করে এবং বিভিন্ন ধরনের অশালীন মন্তব্য ও ইভটিজিং করতে থাকে।
এনিয়ে প্রতিবাদ করায় তাদের সঙ্গে ভিকটিম এবং তার বন্ধুর বাকবিত-া হয়। পরবর্তীতে তাদেরকে জোরপূর্বক ঘটনাস্থলের পাশে ঢালু জায়গায় নিয়ে যেতে চাইলে ভুক্তভোগীর বন্ধু বাঁধা দেয়ায় গ্রেপ্তাররা তাকে মারধর করে। গ্রেপ্তাররা ভিকটিমকে স্থানীয় একটি ভবনে নিয়ে গিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। গ্রেপ্তার রাকিব মিয়া ওরফে ইমন স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম সম্পন্ন করে। সে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে রিসেপশনিস্ট হিসেবে চাকুরি করে। ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে মাদক ও মারামারির মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তার পিয়াস ফকির গোপালঞ্জের একটি পাওয়ার হাউজে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে। গ্রেপ্তার প্রদীপ বিশ্বাস স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছে। সে গোপালগঞ্জে হোম সার্ভিসের মাধ্যমে এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ করে। গ্রেপ্তার নাহিদ রায়হান স্থানীয় একটি কলেজে স্নাতক ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত। গ্রেপ্তার হেলাল স্থানীয় একটি কলেজে স্নাতক ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত। সে একটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন সেলস অফিসার হিসেবে চাকুরি করতো। গ্রেপ্তার তূর্য মোহন্ত খুলনার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৮ সালে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য বিদেশ গমন করে।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ শেষ বর্ষে থাকাকালীন কোভিড পরিস্থিতির কারণে সে দেশে চলে আসে এবং গোপালগঞ্জে সদরে গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করে বলে জানা যায়। গ্রেপ্তার তূর্যের বিরুদ্ধে একটি মারামারির মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, এবারই প্রথম তারা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে ভুক্তভোগী ও তার বন্ধু কেউই অপরাধীদের চিনতো না।
অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করেছে। তবে র্যাব-৮ সফল হয়েছে। তারা নিয়মিত জুয়া খেলতো, আড্ডা দিতো গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ হেলিপ্যাড এলাকায়। গ্রেপ্তার ছয়জনই যে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সে সম্পর্কে র্যাবের কাছে কি ধরণের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হবার পর গোয়েন্দা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ওই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
সেটা বিজ্ঞ তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে উত্থাপন করবেন। গ্রেপ্তারদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সে সম্পর্কে জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পাইনি। তবে তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অপরাধে মামলার আসামি। তবে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে মূলতঃ পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই।