115
Sharesকারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্তির দাবিতে ফের আন্দোলন শুরু করেছেন সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ১৪ জন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। রাত আটটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিক্ষকরা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। এর আগে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি একটি সুপারিশ দিলেও সরকার পরিবর্তনের পর তা আর এগোয়নি।
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ডিপ্লোমাধারী একজনকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পঞ্চম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার সকাল থেকে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি তারা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে মুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। কলেজের প্রশাসনিক ভবনে ১৪ জন শিক্ষককে অবরোধ করে রাখেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে তারা ঘোষণা দিয়েছেন। দিনভর তারা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রেখেছেন ক্যাম্পাস। রাত আটটায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় আন্দোলন চলছিল।
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আন্দোলনরত চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষাবোর্ড থেকে আমাদের কলেজকে বের করে দেওয়ার জন্য অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় আন্দোলন হয়েছিল। ওই সময় শিক্ষার্থীরা অনশনের মতো কর্মসূচিতেও যান। পরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড একটি উচ্চতর কমিটি গঠন করে। সে কমিটি সুপারিশ দিয়েছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। দেশের চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে কারিগরি বোর্ড থেকে মুক্ত করে সংশ্লিষ্ট বিশ^বিদ্যালয়ের অধিনে দেওয়ার মত দেওয়া হয়েছিল এতে। এরপর কারিগরি বোর্ড রেজ্যুলেশন প্রকাশ করেছিল যে দ্রুত এ কাজ শুরু করবে। কিন্তু অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর একটি আর এগোয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও সচিবরা এসেছিলেন। তখন আমরা বলেছি, ডিপ্লোমা থেকে নিয়োগ হওয়া শিক্ষক আমরা চাই না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সম্প্রতি একজন ডিপ্লোমা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষক, উনি সান্ধ্যকালীন ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। যেসব সার্টিফিকেট কিনতে পাওয়া যায়। এরকম একজন উনি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে পঞ্চম গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছেন। ওটা আমরা মানিনা। পাশাপাশি যেহেতু আমরা দুই দিন পরে পরে আন্দোলন করতে পারব না সেজন্য একইসঙ্গে আমাদের দাবি আমরা পুরো সিস্টেমটাকেই চাই না। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডকে চাই না।’
এজন্য কলেজের সকল শিক্ষককে প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত দাবি মানা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা অবরুদ্ধ থাকবেন। স্যারদের আমরা সরাসরি বলে দিয়েছি কেউ আসবেও না, কেউ যাবেও না যতক্ষণ দাবি মানা না হচ্ছে। উনারা মন্ত্রণালয়ে জানাক, মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।’
আন্দোলন চলাকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জানিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ‘আজকে (রবিবার) আন্দোলনের মধ্যেও আমরা শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেম। সেখানে প্রো ভিসির সঙ্গে সভা করেছি। তিনি বলেছেন, সরকার যদি কারিগরি বোর্ড থেকে বের করে দেয় তাহলে সাস্ট আইটি হিসেবে নিতে প্রস্তুত। তাদের অসুবিধা নেই।’ তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, ‘আন্দোলন চলা অবস্থায় বিকেলে হঠাৎ কলেজের অধ্যক্ষকে বদলি করে ফেলেছে।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ‘কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকার কারণে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির স্বকীয়তা ও পেশাগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত দাবি ও আন্দোলন সত্ত্বেও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে কলেজটিকে মুক্ত করার বিষয়ে কোনো আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক কালক্ষেপণের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো উচ্চতর ডিগ্রির মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকতে চান না। শিক্ষার্থীদের একমাত্র দাবি হচ্ছে, অবিলম্বে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্তি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্তির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব ও একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
এদিকে কর্মসূচি চলাকালে বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাজ্জাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে অধ্যক্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কর্তব্যরত সহযোগী অধাপক মো. আসাদুজ্জামানকে ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বদলি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যক্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাহিদ ইকবালকে পদায়ন করা হয়। আগামীকাল সোমবারের মধ্যে তাঁদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে বদলি করা কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বদানকারী চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিক্ষার্থীরা এ বদলির আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের দাবি না মানা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বদলি হওয়া অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে দেবেন না। এমনকি নতুন বদলি হয়ে আসা অধ্যক্ষকেও তাঁরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেবেন না। দাবি আদায়ের আগপর্যন্ত পুরো ক্যাম্পাস শাটডাউন থাকবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আসাদুজ্জামান দেশদর্পণকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, তারা শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে।’ তাকে বদলি করা হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, খবর সঠিক আমাকে বদলি করা হয়েছে।’ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’