95
Sharesফুটবলে একটি সত্য বারবার ফিরে আসে। চ্যাম্পিয়নরা অনেক সময় প্রতিপক্ষের কাছে নয়, হেরে বসে নিজেদের কাছেই। মায়ামির সেই রাতে আর্জেন্টিনা যে বিপদের মুখে পড়েছিল, তার পেছনে কেপ ভের্দের অসাধারণ কোনো কৌশলের চেয়ে বড় কারণ ছিল নিজেদের আত্মতুষ্টি। আত্মবিশ্বাস আর আত্মতুষ্টির মাঝের সূক্ষ্ম ফাঁকটা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
কেপ ভের্দে নামটা শুনলে মানচিত্রে আঙুল রাখতেও
হয়তো সময় লাগে অনেকের। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে দূরে ছোট্ট এক দ্বীপপুঞ্জ, যাদের
ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার অভিজ্ঞতাই ছিল না এতদিন। অথচ গ্রুপ পর্বে
স্পেনের সাথে গোলশূন্য ড্র, উরুগুয়ের সাথে ২-২, সৌদি আরবের সাথে আরেকটা গোলশূন্য ড্র
তিন ম্যাচে অপরাজিত থেকে তারা তৃতীয় স্থান থেকেই উঠে এলো নকআউটে, চার নবাগত দলের মধ্যে
একমাত্র দল হিসেবে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে। এই কীর্তিটাই বলে দেয়, প্রতিপক্ষ যতই ছোট নাম
হোক, মাঠে নামলে তারা মোটেও ছোট দল ছিল না।
আর্জেন্টিনা শুরুটা করেছিল স্বপ্নের মতোই।
২৯ মিনিটে মেসির সেই ছুটে যাওয়া, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত থ্রু বল, আর গোলরক্ষক
ভোজিনিয়ার মাথার ওপর দিয়ে বলটা জালে জড়িয়ে দেওয়া এই একটা মুহূর্তেই মেসি লিখে
ফেললেন নতুন এক ইতিহাস, বিশ্বকাপে তার নিজের কুড়িতম গোল, টুর্নামেন্ট-ইতিহাসের সর্বোচ্চ
গোলদাতার তালিকায় নিজেকে আরও উঁচুতে তুলে। কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর এক খেলা। একজনের
মহিমা কখনও কখনও গোটা দলের মনোযোগ কেড়ে নেয়, আর ঠিক তখনই বাকিরা ভুলে বসে, ম্যাচটা
এখনও শেষ হয়নি।
আমার চোখে প্রথম ভুলটা ধরা পড়ে ঠিক এখানেই,
মানসিক ছন্দপতন। এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার রক্ষণ যেন কিছুটা হেলান দিয়ে
বসে পড়েছিল, ভেবে নিয়েছিল কাজ শেষ।
অথচ দেরয় দুয়ার্তের সমতাসূচক গোলটা এসেছিল
ঠিক সেই আত্মতুষ্টির ফাঁক গলেই। বড় দলের কোচরা খেলোয়াড়দের বারবার শেখান এক গোলে
এগিয়ে থাকা আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়, কারণ ওই মুহূর্তেই মাথা ঢিলে হয়ে যায় সবচেয়ে
বেশি। আর্জেন্টিনা যেন সেই পুরনো ফাঁদে পা দিয়েছিল, প্রতিপক্ষকে ছোট ভেবে নিজেদের
অজান্তেই গতি কমিয়ে ফেলেছিল।
অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কর্নার
থেকে হেডে আবার এগিয়ে যাওয়া এই পর্যন্ত গল্পটা চেনা ছকে ফিরছিল। কিন্তু তারপর যা
ঘটল, তা রীতিমতো ফুটবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার মতো। সিদনি লোপেস কাব্রালের
বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া বাঁক খাওয়া শটটি জালের কোণে গিয়ে এমনভাবে ঠাঁই নিল, যেন
সেটি শুধুই গোল হওয়ার জন্যই। এমন একটি গোল যেকোনো বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে
পারে।
পরিসংখ্যানও যেন এই নাটকীয়তাকে আরও স্পষ্ট
করে। পুরো ম্যাচে কেপ ভের্দের এক্সপেক্টেড গোল ছিল মাত্র ০.৪৫, যেখানে আর্জেন্টিনার
ছিল ২.১৬। সুযোগের বিচারে আর্জেন্টিনা ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। কিন্তু ফুটবল কখনও শুধু
সম্ভাবনার খেলা নয়। শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় সেই একটি নিখুঁত মুহূর্ত, আর সেই
মুহূর্তগুলোকে গোলে রূপ দিতে কেপ ভের্দে ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ক্লিনিক্যাল।
তাহলে প্রশ্ন হলো, ডিফেন্সের ঘাটতিটা ঠিক
কতটা গভীর? আমার মতে এটা কোনো কাঠামোগত সমস্যা নয়, বরং মনোযোগের সমস্যা।
রক্ষণে থাকা প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক মানের
খেলোয়াড়। কিন্তু দুটি গোলের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ক্ষণিকের এক গা-ছাড়া ভাব, প্রতিপক্ষকে
যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা। বড় দলগুলোর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ প্রায়ই তারা
নিজেরাই। যখন তারা অবচেতনেই বিশ্বাস করে বসে, ছোট দলের বিপক্ষে ম্যাচটি এমনিতেই জিতে
যাবে, তখনই বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। কেপ ভের্দে সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিটি ফাটল নিখুঁতভাবে
কাজে লাগিয়েছে।
আর্জেন্টিনার শেষ পর্যন্ত মুক্তি আসে ১১১
মিনিটে। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভের্দের এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে জালে ঢুকে
যায়। ভাগ্যের সামান্য ছোঁয়া ছাড়া এই জয় হয়তো পূর্ণতা পেত না। আর সেই সত্যটাই আর্জেন্টিনার
জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। উদযাপনের আড়ালেও তাদের বুঝতে হবে, এই জয় যতটা না স্বস্তির,
তার চেয়ে বেশি দিয়ে গেছে শিক্ষা।
এই জয়ে রাউন্ড ১৬ নিশ্চিত হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের।
আগামী ৭ জুলাই মিশরের মুখোমুখি হওয়ার আগে তাই অন্তত তিনটি জায়গায় লিওনেল স্কালোনির
দলের উন্নতি জরুরি।
প্রথমত, রক্ষণে আরও জোরালো নেতৃত্ব। এমন একজন দরকার, যিনি দল এগিয়ে থাকলেও সবাইকে একই তীব্রতায় সজাগ রাখবেন।
দ্বিতীয়ত, সেট-পিস এবং ট্রানজিশনের মুহূর্তে মনোযোগের ধারাবাহিকতা। কেপ ভের্দের দুটি গোলই এসেছে এমন সময়ে, যখন আর্জেন্টিনার রক্ষণ পুরোপুরি সংগঠিত ছিল না।
তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার
মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। মিশর কোনোভাবেই কেপ ভের্দের চেয়ে সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তাদের
দলে মোহামেদ সালাহর মতো একজন ফুটবলার আছেন, যিনি একাই একটি ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে
পারেন, যেমনটি কাব্রাল করেছিলেন মায়ামির সেই সন্ধ্যায়।
তবু এত সমালোচনার পরও একটি কথা স্বীকার করতেই
হয়। চ্যাম্পিয়নদের আসল পরিচয় ধরা পড়ে ঠিক এমন মুহূর্তেই। যখন সবকিছু হাতছাড়া হয়ে
যাওয়ার উপক্রম, যখন প্রতিপক্ষের উল্লাসে চারপাশ কেঁপে ওঠে, তখনই মেসি, মার্তিনেজ কিংবা
রোমেরোরা জয়ের নতুন পথ খুঁজে নেন। এটাই বড় দলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
কিন্তু সতর্কবার্তাটিও সমান স্পষ্ট। মিশরের বিপক্ষে যদি একই আত্মতুষ্টি ফিরে আসে, তবে হয়তো এবারের মতো কোনো আত্মঘাতী গোল তাদের উদ্ধার করতে আসবে না। ফুটবল একই শিক্ষা বারবার দেয় না। প্রথম ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ মিলতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়বার সেই সুযোগ নাও আসতে পারে।
আরসি-০২