সিলেট প্রতিক্ষণ



দেশদর্পণ প্রতিবেদক

সেপ্টেম্বর / ২৯ / ২০২৬


ভবন থেকে বেরুলেও ক্যাম্পাসে এখনো অবরুদ্ধ সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষকরা


94

Shares


  • দাবিতে অনড় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা
  • ক্যাম্পাস পরিদর্শনে সিসিক প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক
  • শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে কলেজে প্রবেশ করতে পারেননি নতুন অধ্যক্ষ

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আন্দোলন দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত করেছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্তির দাবিতে গত রবিবার বেলা ১১টা থেকে প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা ১৪ শিক্ষক সোমবার রাত নয়টার দিকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বেরুতে পারলেও ক্যাম্পাসে তাদের অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখেছেন আন্দোলনকারীরা।

সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখার সময় ক্যাম্পাসে কর্মসূচি চলছিল। 

সোমবার রাত ১১টায় যোগাযোগ করা হলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বদলীকৃত অধ্যক্ষ মো. আসাদুজ্জামান নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা রয়েছি। 

আসাদুজ্জামান দেশদর্পণকে বলেন, ‘প্রশাসনিক ভবন থেকে বের হতে পেরেছি কিন্তু এখনও ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারিনি। সব ফটক তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আন্দোলন এখনও অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থীরা।’

এদিকে চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে সোমবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে ক্যাম্পাসে যান সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সাঈদা পারভীন প্রমুখ।  

এ সময় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘তিন মাস সময়ের মধ্যে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করে দেওয়া হবে ‘ কিন্তু শিক্ষার্থীরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং দ্রুত সময়ে প্রজ্ঞাপন দিয়ে শাবিপ্রবির ইনস্টিটিউট হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে অর্ন্তভূক্তি করার দাবি জানান।

এর আগে সোমবার দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা জানান, সাঈদা পারভীন তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে আলোচনায় তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়নি। পরে শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে আলোচনায় বসার আহবান জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী দেশদর্পণকে বলেন, ‘আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় রবিবার বর্তমান অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামানকে বদলি করে তাঁর স্থলে নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে সাহিদ ইকবালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সোমবার বিকেলে কলেজে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে শিক্ষার্থীদের বাঁধার মুখে তিনি ফটক থেকে ফেরত যান।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। নতুন কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেবেন না তারা। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. সাহিদ ইকবাল ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে প্রবেশ করতে পারেননি।

মো. সাহিদ ইকবাল বলেন, ‘আমি সিলেটেই আছি। পরিস্থিতি অনুকূল হলে কলেজে গিয়ে দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই।’ কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সাহিদ ইকবাল এর আগেও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যোগ দেন। রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ তাকে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়। একই আদেশে অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহযোগী অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামানকে ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বদলি করা হয়। 

তবে মো. আসাদুজ্জামানের অপসারণ বা বদলি শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল না। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়। তারা সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন।

এ কারণে অধ্যক্ষ বদলের সিদ্ধান্তেও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি শিক্ষার্থীরা। তাদের বক্তব্য, একজন অধ্যক্ষের জায়গায় আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলে কলেজের প্রশাসনিক কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয় না। নতুন অধ্যক্ষ সাহিদ ইকবাল এর আগেও এই কলেজে কর্মরত ছিলেন। ফলে এ সিদ্ধান্তকে তারা তাদের দাবির কোনো সমাধান হিসেবে দেখছেন না।

মূলত অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই সিলেটসহ দেশের সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে বের করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। সে সময় অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আন্দোলনের পর বিষয়টি পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বা আইআইটি ধরনের কাঠামোয় নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরও এ বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

এর মধ্যে সম্প্রতি কলেজের একটি বিভাগে একজন শিক্ষককে উচ্চতর পদে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে আবার অসন্তোষ দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে নিয়োগ পাওয়া কিছু শিক্ষকের একাডেমিক পটভূমি এবং বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যায়ে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের আপত্তি রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

শিক্ষার্থীরা সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। অবরোধের কারণে কলেজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও তাদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনার সময় সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে কয়েকবার কথা হয়েছে। তোমাদের অনেক প্রতিনিধির সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তোমরাই তোমাদের প্রতিনিধিদের আমাদের কাছে পাঠিয়েছ। সকালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে আমি ও জেলা প্রশাসক একসঙ্গে বসে তোমাদের সব সমস্যার কথা শুনেছি।’

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তোমাদের উত্থাপিত সব সমস্যারই যৌক্তিক দাবি রয়েছে। আমি কোনো দাবিকেই অযৌক্তিক বলব না।’

তবে কলেজটির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত সরকারের বিষয় উল্লেখ করে সিসিক প্রশাসক বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোন মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোন বিভাগে রাখা হবে, সেটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ রয়েছে। সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির সমাধানের একটি পথ রয়েছে। বর্তমানে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শাবিপ্রবির অধিভুক্ত। অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষা, ফলাফল ও সনদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিন্ডিকেট সদস্য। চাইলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করতে পারি। যেহেতু এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে, তাই এটি বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হবে বলে আমি মনে করি না।’

তবে তার লক্ষ্য শুধু ইনস্টিটিউট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা নয়, প্রতিষ্ঠানটিকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাই, এ বিষয়ে তোমাদের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কথা বলতে এবং আগে যাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, তাদের মতামতও নিতে। আমার ইচ্ছা হলো, শেষ পর্যন্ত এটি একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক।’

দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে সিসিক প্রশাসক বলেন, খুলনা, রাজশাহী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো প্রথমে কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরে ইনস্টিটিউট এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘কলেজটি প্রতিষ্ঠার সময় অনুষ্ঠিত একটি সভায় তাঁর উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এবং সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত এম সাইফুর রহমান।’

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর আরও বলেন, ‘ওই সভায় সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আগে কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হোক, পরে সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হবে। কারণ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একইভাবে ধাপে ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ওই সভার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ডিপিপিতেও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।


ওয়াইএফ/০১

সিলেট প্রতিক্ষণ