291
Sharesহাওরের দুর্গম এলাকা সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলা। যেখানে পাকা রাস্তা নেই বললেই চলে। উপজেলার প্রতিটি গ্রামে যেতে হলে হাওর-বিলঝিল পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। সে জন্য এ এলাকায় যাতায়াতের প্রথম পছন্দের তালিকায় রয়েছে মোটরবাইক। এ উপজেলার একশ ঘরের মধ্যে নব্বই ঘরই হিন্দু সম্প্রদায়ের। আর সেই তালিকায় রয়েছে উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রাম।
নোয়াগাঁও গ্রামে সেদিন কী এমন ঘটেছিল, দেশজুড়ে সে আলোচনা তুঙ্গে। এরই খোঁজ করতে বৃহস্পতিবার গ্রামটি ঘুরে করে যা পাওয়া যায় তা রীতিমতো অবাক করার মতো। তার আগে জানিয়ে রাখি ১৫ মার্চ (সোমবার) জেলার দিরাই উপজেলা হেফাজতে ইসলামের শানে রিসালাত সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে এসে বক্তব্য দেন দলটির কেন্দ্রীয় আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির নূরুল ইসলাম খান, জুনাইদ আল হাবীব ও দলটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। জানা যায়, সম্মেলনের পরে মাওলান মামুনুল হককে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত নয়াগাঁও গ্রামের গুপেন্দ্র দাশের ছেলে ঝুমন দাশ আপন নামের এক যুবক ফেসবুকে কটূক্তি করেন।
সঙ্গে সঙ্গে তা ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে যায়। ফলে আশপাশের গ্রামের মামুনুল হকের অনুসারীরা জড়ো হয়ে মিছিল করেন। এই ঘটনার খবর পেয়ে শাল্লা থানা-পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তারের আশ্বাস প্রদান করে এবং পরে ১৬ মার্চ (মঙ্গলবার) রাত ১১টায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শাসকাইবাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিস্থিতি শান্ত থাকার পর হঠাৎ কেন এবং কী করে পরদিন সকাল ১৭ মার্চ (বুধবার) সকালে হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামে মামুনুল হকের অনুসারীদের সংঘবদ্ধ হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট হামলা, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে! এর নেপথ্যে কি আরও কোনো ঘটনা রয়েছে। হামলার নেতৃত্ব বা ইন্ধনদাতা কারা কারা। প্রকাশ্যে মাইকিং করে হিন্দুদের বাড়িতে হামলার ঘটনার পেছনে আর কোনো ঘটনা লুকায়িত আছে কি না, এমন প্রশ্ন করেছেন অনেকেই।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ভুক্তভোগী ও স্থানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নোয়াগাঁও হিন্দুদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরে যোগ দিয়েছিলেন নাচনী, চন্ডিপুর, সন্তোষপুর, ধনপুর, খাশিপুরসহ দিরাই শাল্লা উপজেলার কয়েক গ্রামের হাজারো মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন দিরাই উপজেলার নাচনী গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম স্বাধীন ও একই গ্রামের ক্ষমতাধর আরেক ব্যক্তি পক্কন মিয়া। জানা যায়, নাচনী গ্রামের স্বাধীন স্থানীয় বরাম হাওরের কুচাখাই বিলের ইজারাদার। জলমহাল নিয়ে স্বাধীনের সঙ্গে কিছুদিন ধরে গ্রেফতার যুবক ঝুমন দাশসহ নোয়াগাঁও গ্রামে কিছু লোকের বিরোধ চলে আসছিল। জলমহালে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও জলমহালের পানি শুকানোর ফলে চাষাবাদে সেচের পানির সংকটের ব্যাপারে নোয়াগাঁও গ্রামের হরিপদ দাশ ও মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ দন্দ্র দাস শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্বাধীন মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ জানুয়ারি সরেজমিনে কুচাখাই বিলে গিয়ে অবৈধ সেলাইমেশিনসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করে জলমহালের পানি ছেড়ে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মোক্তাদির হোসেন। এ সময় বাঁধ কাটার কাজে নোয়াগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাসের ছেলে অমর চন্দ্র দাস ও পানি ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্য ফেসবুকে প্রচার করেন একই গ্রামের ঝুমন দাশ। এই ঘটনায় স্বাধীন মেম্বার নোয়াগাঁও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকিধমকি দিয়ে আছিলেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ঝুমন দাশের এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে হেফাজতের অনুসারী ও তার নিজস্ব লোকদের দিয়ে বুধবার নোয়াগাঁও গ্রামে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ করে গ্রামের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।
বলা চলে, মামুনুল হকের অনুসারীদের কাঁধে ভর করে হিন্দুদের বাড়িতে তাণ্ডব চালায় স্বাধীন মেম্বার। অভিযোগ রয়েছে, গত মঙ্গলবার হেফাজতের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে উদ্দেশ করে গ্রামের এক যুবকের দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে হিন্দু-অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে যে হামলা চালানো হয়েছে তাতে ৩০-৩৫টি ঘরবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপজেলায় শাল্লার এমন ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ বিভাগসহ সরকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
নোয়াগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সৈলেন চন্দ্র দাশ বলেন, স্বাধীন ও পক্কনের নেতৃত্বে আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। তারা আমার ঘরের টাকাপয়সা অলংকার নিয়ে গেছে। স্বাধীনের সঙ্গে আমাদের গ্রামবাসীর বিরোধ ছিল। সে বরাম হাওরের কুচাখাই বিল সেচতে চায় আমরা গ্রামবাসী বাঁধা দিই। বিল সেচার কারণে জমিতে পানি দেওয়া যায় না। পানির অভাবে জমিক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। এই বিষয়ে আমরা ইউএনও সাহেবের কাজে অভিযোগ করি। অভিযোগকারী ছিলেন আমার কাকা হরিপদ দাশ।
এই কারণেই হরিপদবাবুর আত্মীয়স্বজনের বাড়িঘর বেশি ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাশ বলেন, “আমি ঘরে ছিলাম। আমার ঘরের দরজা ভেঙে টাকাপয়সা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটসহ অনেক কিছু নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা বলার পরও তারা আমারে রেহাই দেয়নি। শত শত মানুষ। আমি শুধু পক্কন মিয়া ও স্বাধীন মেম্বারকে চিনেছি।” এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। হামলাকারীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি। ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিকেল ৪টার দিকে মামলা করা হলেও নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে বাদী ও আসামির নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ।
অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত হেফাজতের নেতা-কর্মীসহ মূল ইন্ধনদাতাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। বৃহস্পতিবার নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। এদিকে- বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) গভীর রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২২ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক। তিনি জানান, ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে আটকদের পরিচয় প্রকাশ করেননি তিনি।
এর আগে হামলার ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুইটি পৃথক দুটি মামলা করা হয়। শাল্লা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল করিম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। অন্যটি করেন হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত মিলিয়ে দুই মামলায় মোট ১৫০০ জনকে আসামি করা হয়ে