খেলাধুলা



রাফিদ চৌধুরী

জুলাই / ০২ / ২০২৬


‘বুড়ো ঘোড়া’দের শেষ লড়াই


107

Shares

ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙানো অ্যালার্মটা যখন বেজে উঠবে, তখন পৃথিবীর অনেকখানি অন্ধকার। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সেই অন্ধকারে জেগে উঠবেন যারা, তাদের চোখে ঘুম লেগে থাকবে, কিন্তু বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা! কারণ টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে মুখোমুখি হবে দুই ইউরোপীয় শক্তি, পর্তুগাল আর ক্রোয়েশিয়া। কেউ জানে না এই ম্যাচ আসলে কী নিয়ে খেলা হবে। রাউন্ড ১৬ নিশ্চিত, নাকি সময়ের বিরুদ্ধে দুই বৃদ্ধ যোদ্ধার শেষ লড়াই।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর লুকা মদরিচ এই দুই নাম একদিন ছিল যুদ্ধের দুই প্রান্তে, ব্যালন ডি'অরের সোনালি মঞ্চে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, মেসি-নেইমারদের ভিড়ে যারা বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিলেন গোটা একটা যুগকে। এখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠেও, কিন্তু আসল প্রতিপক্ষ কেউ চেনে না, দেখা যায় না, ট্যাকল করা যায় না সেই প্রতিপক্ষের নাম সময়।

এক সময় যে দুটো ঘোড়া গোটা মাঠ কাঁপিয়ে দৌড়াত, প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলত এক ঝলকে, আজ তারাই বুড়ো হয়ে গেছে। লাগাম এখনও তাদের হাতেই, কিন্তু পায়ে আর সেই আগের গতি নেই, শ্বাসেও আগের সেই দম নেই। তবু বুড়ো ঘোড়া যুদ্ধের ময়দান চেনে ভালো, চেনে কখন কোথায় পা ফেলতে হয়, কখন গতি বাঁচিয়ে রাখতে হয় শেষ আক্রমণের জন্য।

রোনালদোর বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে, মদরিচের চল্লিশ ছুঁইছুঁই। দুজনেই জানেন, ২০২৬-এর এই বিশ্বকাপের পরে হয়তো আর কোনো বিশ্বকাপ তাদের জন্য অপেক্ষা করবে না, লাগাম হয়তো আর কখনও পরানো হবে না তাদের গায়ে এই মঞ্চে।

তাই শুক্রবারের এই একটা ম্যাচ আসলে অনেকগুলো ম্যাচের সমষ্টি একটা ক্যারিয়ারের শেষ কটা পাতা, একটা প্রজন্মের বিদায়ী ভাষণ, দুটো বুড়ো ঘোড়ার শেষ ছুটে চলা, যা লেখা হবে ঘাসের ওপর, বলের গতিতে, ফুসফুসের শেষ কটা নিঃশ্বাসে।

২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়া উঠেছিল বিশ্বকাপ ফাইনালে, মদরিচের পায়ে তখন জাদু, লুঝনিকির মাঠে ফ্রান্সের কাছে হারলেও গোটা বিশ্ব চিনেছিল এক ছোট্ট দেশের বিশাল হৃদয়কে। ২০২২ সালে আবার সেমিফাইনাল, আবার সেই লড়াকু মানসিকতা। অথচ এবার সেই ক্রোয়েশিয়াকেই তাড়া করছে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম নকআউট ম্যাচেই বিদায় নেওয়ার শঙ্কা।

আর পর্তুগাল? কাতারের মরুভূমিতে যে মরক্কো তাদের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেই একই মরক্কোকে হারিয়ে তৃতীয় হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল ক্রোয়েশিয়াকেও। নিয়তির নিষ্ঠুর রসিকতায় আজ তাদেরই মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে, জেনে-বুঝেই যে এই দুইয়ের একজনকে বিদায় নিতে হবে টুর্নামেন্টের একদম গোড়াতেই।

ইতিহাস বলে অন্য কথা অবশ্য। দুই দল মুখোমুখি হয়েছে দশবার, সেই ১৯৯৬ সাল থেকে। যেবার লুইস ফিগো চার মিনিটেই গোল করে বসেছিলেন আর পর্তুগাল জিতেছিল ৩-০ গোলে। ২০১৮ সালে প্রথমবার একটা প্রীতি ম্যাচে ১-১ ড্র করে সেই দীর্ঘ খরা ভেঙেছিল। দশ সাক্ষাতে পর্তুগালের জয় সাতটিতে, ক্রোয়েশিয়ার মোটে একটিতে, বাকি দুটি ড্র।

কিন্তু পরিসংখ্যান তো অতীতের ছায়া মাত্র, বর্তমানের আলো নয়। ২০২৪ সালের জুনে জামোরের মাঠে মদরিচ আর আন্তে বুদিমিরের গোলে প্রথমবারের মতো পর্তুগালকে হারিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। তিন মাস পর পর্তুগাল প্রতিশোধ নিয়েছিল নেশনস লিগে, আর সবশেষ সাক্ষাতে ম্যাচ শেষ হয়েছিল ১-১ ড্রয়ে। অর্থাৎ ইতিহাসের পাল্লা পর্তুগালের দিকে হেলে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময় বলছে সেই ব্যবধান ক্রমশ সরু হয়ে আসছে সুতোর মতো।

গ্রুপ পর্বের পথটাও ছিল টলমল দুই দলেরই। পর্তুগাল শুরু করেছিল কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ড্র দিয়ে, তারপর উজবেকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ৫-০ গোলে, আর শেষ ম্যাচে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য থেকে গিয়েছিল রানার্সআপ হয়েই। রবার্তো মার্তিনেজের দলের পায়ে বল থাকলে বিপজ্জনক, কিন্তু পুরো ছন্দ এখনও যেন ফিরে পায়নি তারা। একটা সেতার যার একটা তার এখনও ঠিক সুরে বাঁধা হয়নি।

ক্রোয়েশিয়া আবার শুরুতেই হোঁচট খেয়েছিল, ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হেরে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে পানামাকে হারিয়েছিল ১-০ গোলে, ঘানাকে ২-১ গোলে। কিন্তু রক্ষণে সেই পুরনো ফাটল এখনও স্পষ্ট সাম্প্রতিক ছয় ম্যাচে ১১ গোল হজম করেছে তারা, যেখানে পর্তুগাল হজম করেছে মোটে তিনটি। ঠিক এইখানেই, এই একটা ব্যবধানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে আগামীকালের ভাগ্য।

মাঠে নামার আগে দুই কোচই হয়তো বসে আছেন নিজের নিজের ছকের সামনে, ভাবছেন কোন মুখগুলো লিখে দেবেন প্রথম একাদশে। পর্তুগালের সাজঘরে দিয়োগো কস্তা, জোয়াও কানসেলো, রুবেন দিয়াশ, রেনাতো ভেইগা, নুনো মেন্দেসদের পাশে জোয়াও নেভেস আর ভিতিনিয়ার মাঝমাঠ, পেদ্রো নেতো-ব্রুনো ফের্নান্দেজ-জোয়াও ফেলিক্সের সৃজনশীলতা, আর সবার সামনে সেই চিরচেনা এক মুখ, যার নাম শুনলেই এখনও গ্যালারি কেঁপে ওঠে।

ক্রোয়েশিয়ার দিকে দমিনিক লিভাকোভিচের নিচে জোসিপ স্তানিসিচ, জোসিপ সুতালো, মারিন পোনগ্রাচিচ, জোশকো গভার্দিওল, মাঝমাঠে মদরিচ-কোভাচিচের অভিজ্ঞতা, আর সামনে ভ্লাসিচ-সুচিচ-পেরিসিচ-বুদিমিরের ধার।

বুকমেকারদের হিসেব পর্তুগালকেই এগিয়ে রাখছে, জয়ের সম্ভাবনা প্রায় পৌনে দুই, ড্র প্রায় তিনগুণ। কিন্তু ফুটবল তো সংখ্যার খাতা মেনে চলে না, সে চলে হৃদয়ের হিসেবে। সাম্প্রতিক সাক্ষাতে দুই দল মিলিয়ে গড়ে আড়াইয়ের বেশি গোল হয়েছে প্রতি ম্যাচে, প্রায় প্রতি ম্যাচেই দুই দলই গোল পেয়েছে। অর্থাৎ রক্ষণাত্মক দাবা নয়, বরং খোলা তরোয়ালের লড়াই অপেক্ষা করছে হয়তো।

তবু সব পরিসংখ্যান, সব ছক, সব বাজির অঙ্ক ছাপিয়ে যে দৃশ্যটা মনে গেঁথে থাকবে, তা বোধহয় অন্য কিছু। ভোরের আলো ফোটার আগে টিভি স্ক্রিনে যখন ফুটে উঠবে বিএমও ফিল্ডের সবুজ গালিচা, তখন দর্শক আসলে দেখবেন দুই বুড়ো ঘোড়ার শেষ দৌড় একজন যিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে এখনও অবিশ্বাস্য, আর একজন যিনি চল্লিশ বছর বয়সেও মাঠ শাসন করার সাহস রাখেন। একটা ঘোড়া আজ আরেকটু বেঁচে থাকবে এই টুর্নামেন্টে, আরেকটা ফিরে যাবে আস্তাবলে, নিয়ে যাবে গায়ে মাখা এই হয়তো-শেষ বিশ্বকাপের ধুলো আর ঘাম।

জয়-পরাজয়ের বাইরে গিয়ে ভাবলে, এই ম্যাচটা আসলে একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বুড়ো ঘোড়াও কি শেষবারের মতো ছুটে জিততে পারে সময়ের বিরুদ্ধে, অন্তত একটা রাতের জন্য হলেও। উত্তরটা লেখা হবে আগামীকাল, ভোরের আলোয়, ঘড়ির কাঁটার নিঃশব্দ সংঘর্ষে।

আরসি-০৪

খেলাধুলা