খেলাধুলা



রাফিদ চৌধুরী

জুলাই / ১৬ / ২০২৬


এভাবেও ফিরে আসা যায়


106

Shares

চন্দ্রবিন্দুর গানের সেই শিরোনামটা যেন আটলান্টার এই রাতের জন্য লেখা হয়েছিল বহু আগে থেকে। এভাবেও ফিরে আসা যায়। যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে বলেই মনে হয়, যখন ৮৫ মিনিট পেরিয়ে গেছে আর স্কোরবোর্ডে প্রতিপক্ষ এগিয়ে, তখনও ফেরার একটা পথ থেকে যায়, যদি সেই পথ দেখানোর মতো একজন মানুষ থাকে দলে।

মিনাস তিরিথের প্রাচীরে যখন অন্ধকার নেমে এসেছিল, যখন সবাই ধরে নিয়েছিল যুদ্ধ শেষ, ঠিক তখনই দিগন্তে আলো দেখা গিয়েছিল। গ্যান্ডালফ দ্য হোয়াইট, সাদা ঘোড়ায় চড়ে, হাতে জ্বলন্ত এক লাঠি। তিনি নিজে তরবারি চালিয়ে যুদ্ধ জেতাননি কোনোদিন।

তাঁর কাজ ছিল আলো জ্বালানো, পথ দেখানো, আর তরুণ যোদ্ধাদের ঠিক সেই মুহূর্তে সেই জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া, যেখান থেকে তারা নিজেরাই ইতিহাস লিখতে পারে। আটলান্টার এই রাতে লিওনেল মেসি ঠিক সেই গ্যান্ডালফই হয়ে উঠলেন।

ম্যাচের প্রথম ত্রিশ মিনিট ছিল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়া। দুই দল মিলিয়ে একটাও শট নেই, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা বিরল এক ঘটনা। আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট, প্রায় মরিয়া। ইংল্যান্ডকে কৌশলের লড়াই থেকে টেনে আনো মাঠের লড়াইয়ে, ফাউল করো, চাপ দাও, ছন্দ নষ্ট করো। কিন্তু এই কৌশলের মূল্যও দিতে হলো। প্রথমার্ধেই দুই দল মিলিয়ে ১৯টা ফাউল, যার ১২টাই আর্জেন্টিনার। আলবিসেলিস্তেরা যেন সেই রাতে ফুটবলের চেয়ে বেশি লড়েছে যুদ্ধ, অথচ তাতেও কাজ হয়নি প্রথমার্ধে।

৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডন মর্গান রজার্সের ক্রস থেকে এগিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডকে। তারপর ইংল্যান্ড যেন প্রাচীরের পেছনে আশ্রয় নিল, রক্ষণাত্মক এক দুর্গ গড়ে তুলল। জর্ডান পিকফোর্ড সেই দুর্গের রক্ষী হয়ে উঠলেন অবিশ্বাস্য এক ফর্মে, মেসির ক্রস থেকে একটা হেডার অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দিলেন। পঞ্চান্ন থেকে পঁচাশি মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বারবার বল পাঠাল বক্সে, কিন্তু পিকফোর্ড আর ইংল্যান্ডের রক্ষণ প্রতিবারই সেই দরজা বন্ধ করে রাখল।

রোমেরোকে একানব্বই মিনিটেরও আগে হলুদ কার্ড দেখতে হলো, রক্ষণে অতিরিক্ত মরিয়া হয়ে ওঠার মাশুল। এই টুর্নামেন্ট জুড়ে যে দুর্বলতা আর্জেন্টিনার রক্ষণে বারবার দেখা গেছে, গর্ডনের গোলেও সেই একই ছবি।  ট্যাগলিয়াফিকো ওপরে উঠে যাওয়ায় পেছনে খালি পড়ে থাকা জমি, যা প্রতিপক্ষ খুঁজে নিয়েছে নিখুঁত নিশানায়।

তবু, ঠিক যখন মনে হচ্ছিল যুদ্ধ শেষ, দিগন্তে আলো দেখা গেল। সাতাশি মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ, যিনি সারা ম্যাচ জুড়ে পিকফোর্ডকে পরীক্ষা নিয়েছিলেন অক্লান্তভাবে, একটা শর্ট কর্নার থেকে মেসির পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো এক শট নিলেন, পিকফোর্ড ছুঁতেও পারলেন না। গ্যান্ডালফের লাঠির প্রথম ঝলকানি।

তারপর যা হলো, তা বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। স্টপেজ টাইমে ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলো, মেসি সেই রিবাউন্ড থেকে ক্রস করলেন বক্সে, আর লাওতারো মার্তিনেজ হেড করে বল পাঠিয়ে দিলেন জালের বাঁ কোণে। ঠিক যেমন রোহান বাহিনী এসে দাঁড়িয়েছিল মিনাস তিরিথের যুদ্ধক্ষেত্রে গ্যান্ডালফের ইশারায়, লাওতারো মার্তিনেজও এসে দাঁড়ালেন ঠিক সেই মুহূর্তে, ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে ইতিহাস লেখা হয়। ২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও জয়সূচক গোলটা এসেছিল তাঁরই পা থেকে। এবারও তিনিই।

এই পুরো নাটকের কেন্দ্রে একটাই নাম, একটাই মন্ত্র— মেসি। নকআউট পর্বের শেষ আট ম্যাচে সাত গোল আর ছয় অ্যাসিস্ট, ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে থাকা। কিন্তু গ্যান্ডালফ যেমন একা যুদ্ধ জেতাননি, মেসিও একা জেতাননি এই রাত।

স্কালোনির সাহসী আক্রমণাত্মক বদলি, লাওতারো আর নিকোলাস গনসালেসকে মাঠে নামানোর সময়োচিত সিদ্ধান্ত,  এসবও ছিল জয়ের কারিগর। আর ছিল আর্জেন্টিনার সেই অদম্য মানসিক শক্তি, যা এই টুর্নামেন্টে বারবার প্রমাণিত। কেপ ভের্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ড, প্রতিটা ম্যাচেই পিছিয়ে পড়া, প্রতিটাতেই ফিরে আসা। এই দলকে হারানো যায়, কিন্তু শেষ করে দেওয়া যায় না।

সত্যি বলতে, রক্ষণটা আজও ভালো ছিল না। গর্ডনের গোলে ফাঁকা জায়গা, রোমেরোর হলুদ কার্ড, কেইনকে সামলাতে বারবার হিমশিম, এই দুর্বলতাগুলো আজও স্পষ্ট। পিকফোর্ড আর ইংল্যান্ডের দুর্ভাগ্য না হলে ব্যবধান আরও বড় হতেই পারত এই রক্ষণের বিরুদ্ধে। রবিবার নিউ জার্সিতে যখন স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা, ইয়ামাল আর ওলিসের মতো ফুটবলাররা হয়তো এই একই ফাঁকগুলো ক্ষমা করবেন না।

ইংল্যান্ডের জন্য এই রাত এক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। ৬০ বছরের শিরোপা-খরা আরও দীর্ঘ হলো, জিততে জিততে হেরে যাওয়ার সেই চিরচেনা যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হলো তাদের।

আর আর্জেন্টিনা? তারা বারবার প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর আবার ফিরে আসে, ঠিক যেভাবে ফেরার কথা কেউ ভাবতেও পারে না। রবিবার ফাইনালে একদিকে থাকবে মেসির হয়তো শেষ নাচ, অন্যদিকে ইয়ামালের সদ্য শুরু হওয়া উত্থান। ফুটবলের এমন একটা গল্প লেখার জন্যই বোধহয় অপেক্ষা করছিল এই বিশ্বকাপ।

আরসি-০১

খেলাধুলা