খেলাধুলা



রাফিদ চৌধুরী

জুন / ৩০ / ২০২৬


জার্মানির ফিরে আসার রাত


103

Shares


আট বছর। দুটো বিশ্বকাপ। দুটো গ্রুপ পর্বের বিদায়। ২০১৮-তে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে। ২০২২-এ জাপানের কাছে হেরে। পর পর দুটো বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বিদায়। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্য এটা ছিল অভূতপূর্ব লজ্জা। জার্মান ফুটবলের সেই সংকটের দিনগুলোতে অনেকে ভেবেছিল, ডের মানশাফট বুঝি পথ হারিয়ে ফেলেছে।

আজ রাত আড়াইটায় বোস্টনে সেই জার্মানি আবার নকআউটে। প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে।।ফিরে আসার গল্প সহজ হয় না। কিন্তু লেখা হয়।

জার্মানি — তিনটি ম্যাচ, তিনটি ভিন্ন মুখ

গ্রুপ পর্বে জার্মানির যাত্রা শুরু হয়েছিল কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ৭-১ গোলের ভূমিধসে, তারপর আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে, আর শেষটা ইকুয়েডরের কাছে ২-১ বিপর্যয়ে। তিনটি ম্যাচে তিনটি ভিন্ন জার্মানিকে দেখা গেছে।

পূর্বের সংবাদ-

ব্রাজিলের ইতিহাস প্রতিপক্ষ জাপান সম্পর্কে কি বার্তা দেয়

প্রথম ম্যাচে যা দেখা গেছে সেটা ছিল স্বপ্নের মতো। কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে সাত গোলের সেই রাতে মনে হয়েছিল, জার্মানি বোধহয় ২০১৪ সালের সেই দলের ছায়া ফিরিয়ে এনেছে, যারা ব্রাজিলকে একই ব্যবধানে হারিয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে লড়াইটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে জয় এসেছিল। সেই ম্যাচে সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠলেন ডেনিজ উন্দাভ — বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন।

আর তৃতীয় ম্যাচ?

সেটা ছিল সেই হার যা কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে। ইকুয়েডর জার্মানির মাঝমাঠের সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন করেছে। কাইসেদো গভীর মিডফিল্ডে যেভাবে পাসিং লেন বন্ধ করেছিলেন, ফুলব্যাকরা উপরে উঠলে পেছনে যেভাবে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছিল — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ রাতে নাগেলসমানকে দিতে হবে।

তবে জার্মানির শক্তির জায়গাগুলোও স্পষ্ট। মুসিয়ালা-ভিয়েৎস-সানে — এই তিনজনের সমন্বয় যেকোনো রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। নাগেলসমানের সম্ভাব্য একাদশে নয়ার, কিমিখ, তাহ, রুডিগার, রাউম; এনমেখা ও পাভলোভিচ মাঝমাঠে; সানে, মুসিয়ালা, ভিয়েৎস — আর সামনে হাভার্টজ। এই দলের মান নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, চাপের মুহূর্তে কাঠামোটা কতটা শক্ত থাকে?

একটা বড় ধাক্কার কথাও বলতে হবে। রক্ষণভাগের নিকো শ্লটারবেক আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে হাঁটুর লিগামেন্টে চোট পেয়ে বাকি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন। তাঁর জায়গায় রুডিগার। অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু বয়স বাড়ছে। দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে রুডিগারকে পরীক্ষায় ফেলা যায় — প্যারাগুয়ে সেই সুযোগ খুঁজবে।

প্যারাগুয়েকে দেখলে মনে হয় একটা পুরনো দুর্গের কথা। সামনে থেকে ভাঙা কঠিন, কিন্তু নিজেরাও বেশি দূর এগোয় না।

গুস্তাভো আলফারো — যাঁকে দক্ষিণ আমেরিকায় ডাকা হয় 'প্রফেসর' নামে — দলটিকে সাজিয়েছেন রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে। কোয়ালিফাইয়ে পুরো কনমেবল অঞ্চলে সবচেয়ে কম গোলের ম্যাচ খেলেছে প্যারাগুয়ে — ১৮ ম্যাচে মাত্র ১৪ গোল করেছে, খেয়েছে মাত্র ১০টি। সংখ্যাগুলো বলে দেয়, এই দল গোল উৎসবে বিশ্বাসী নয়। বিশ্বাসী নিরাপদ থাকায়।

চার-চার-দুই ছকে আলফারো দলকে বলের বাইরে রাখেন কমপ্যাক্ট দুটো লাইনে, আর বল পেলেই দ্রুত কাউন্টারে ছুটে পড়েন আলমিরন আর চওড়া ফ্ল্যাংকের খেলোয়াড়রা।

গুস্তাভো গোমেজ ও জুনিয়র আলোনসো কেন্দ্রীয় রক্ষণের মেরুদণ্ড। শারীরিক, অভিজ্ঞ, ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ফুটবলে শাণিত। এই জুটি সহজে ভাঙে না।

আর আক্রমণে? হুলিও এনসিসো — ২২ বছর বয়সী এই ছেলেটি প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় অপ্রত্যাশিত অস্ত্র। হাফ স্পেসে ঢুকে প্রতিপক্ষকে অবাক করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। মিগেল আলমিরন গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকার পর আজ মাঠে ফিরছেন — ৩১ বছর বয়সে তিনি এখনও প্যারাগুয়ের আক্রমণের হৃদয়।

কিন্তু ডিয়েগো গোমেজ দুটো হলুদ কার্ড খেয়ে আজ নিষিদ্ধ। মাঝমাঠের এই ক্ষতি ছোট নয়।

গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ের পথচলা মসৃণ ছিল না। আমেরিকার কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তুরস্ককে ১-০ হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, আর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ০-০ ড্র করে তৃতীয় সেরা দল হিসেবে নকআউটে উঠেছে। অর্থাৎ এই দলকে গ্রুপে কেউ সেভাবে দেখেনি, আর এটাই তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

জার্মানির সবচেয়ে বড় বিপদ হবে যদি তারা আবার বলের দখল রেখেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ইকুয়েডর যা করেছিল — পাসিং লেন বন্ধ করা, দ্বিতীয় বল কুড়ানো, দ্রুত কাউন্টার — প্যারাগুয়ে হুবহু সেই ফুটবলেই বিশ্বাস করে।

যদি জার্মানি দ্রুত গোল না করতে পারে, ম্যাচ দীর্ঘ হলে চাপ বাড়তে থাকবে। নকআউটে এই মানসিক চাপ অন্যরকম হয়। আর যদি ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে বা পেনাল্টিতে — তখন কাগজে-কলমের পার্থক্য অনেকটাই মুছে যায়।

কিন্তু জার্মানির শক্তি এখানে বলে রাখা দরকার। মুসিয়ালা-ভিয়ার্টজের মতো খেলোয়াড়রা চাপের মধ্যে সৃজনশীলতা হারান না। উন্দাভ বদলি হিসেবে এসে ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এই টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যেই দেখিয়েছেন। আর রক্ষণে রুডিগারের অভিজ্ঞতা এই মুহূর্তে দলের জন্য শক্তির উৎস।

প্যারাগুয়ে অঘটন ঘটাতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাদের নিখুঁত থাকতে হবে — রক্ষণে, মাঝমাঠে, আর কাউন্টারে। একটু এদিক-ওদিক হলেই জার্মানির মানের খেলোয়াড়রা সেই ফাঁকটা ধরে ফেলবে।

২০১৮ ও ২০২২ — এই দুটো গ্রুপ বিদায় জার্মান ফুটবলের বুকে যে ক্ষত রেখে গেছে, সেটা শুধু ফলাফলের নয়। সেটা আত্মবিশ্বাসের। আজ রাতে জার্মানি শুধু একটা ম্যাচ খেলতে নামছে না। নামছে সেই পুরনো প্রশ্নের উত্তর দিতে — তারা কি সত্যিই ফিরে এসেছে? 

নকআউট ফুটবলে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সবচেয়ে সৎ উপায় হলো মাঠ। আজ রাতে সেই মাঠই কথা বলবে।


ওয়াইএফ/০১

খেলাধুলা