খেলাধুলা



রাফিদ চৌধুরী

জুলাই / ০২ / ২০২৬


পাঁচ তারার ভার, নাকি আটাশ বছরের প্রতীক্ষা


93

Shares

উলেভাল নামের একটা মাঠ। অসলোর উপকণ্ঠে, বরফ গলা এক শীতের শেষে যে মাঠে বাচ্চারা বল নিয়ে দৌড়াত সন্ধের অন্ধকার নামার আগে পর্যন্ত। খুব বড় নাম নয়। নরওয়ের হাজারো ছোট শহরের একটার মতোই সাধারণ একটা মাঠ। ইন্টারনেটে খুঁজলে হয়তো তার ইতিহাস মিলবে না, মিলবে না তার ঘাসে পড়ে থাকা লক্ষ শিশুর স্বপ্নের হিসেব। ঠিক তেমনই মুশকিল খুঁজে পাওয়া রিওর কোনো এক ধুলোমাখা গলি-মাঠের নাম, মারাকানার ছায়া থেকে বহুদূরে, যেখানে বাহিয়ার কোনো বস্তির ছেলে খালি পায়ে বল ঠেলত সন্ধের অন্ধকারে।

আটাশ বছর আগে নরওয়ে শেষবার বিশ্বকাপ খেলেছিল। তারপর দীর্ঘ এক নির্বাসন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে বিশ্বকাপ ছাড়াই। টেলিভিশনের সামনে বসে অন্য দেশের উৎসব দেখেছে, নিজের দেশের জার্সি গায়ে চড়িয়ে শুধু স্বপ্নই দেখেছে, বাস্তবে কিছুই দেখেনি। একটা জাতির ফুটবল-স্মৃতি এভাবেই ধীরে ধীরে জীবাশ্ম হয়ে যায়। বাবার মুখে শোনা গল্প, দাদুর আলমারিতে রাখা পুরনো টিকিট, কোনো এক ম্লান রোববারের অস্পষ্ট বিবরণ।

তারপর হঠাৎ একদিন, আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ছিয়াশি মিনিটে একটা বল জালে জড়ায়, আর আটাশ বছরের নির্বাসন এক লহমায় ভেঙে পড়ে মাটিতে। আর্লিং হালান্ড নামের ছেলেটা, যার বাবা নিজেও এক দশকেরও বেশি সময় ইংল্যান্ডের মাঠে কাটিয়েছিলেন, তারপর একটা নির্মম চোটে যার ক্যারিয়ার হঠাৎ থেমে গিয়েছিল অসমাপ্ত এক আক্ষেপ রেখে, সেই ছেলেটাই যেন গোটা একটা জাতির বুকে জমে থাকা কান্না একবারে গলিয়ে দিল।

ব্রাজিলের গল্পটা উল্টো দিক থেকে লেখা। তাদের কোনো নির্বাসন নেই, আছে শুধু প্রত্যাশার ভার- এমন এক ভার, যা বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে জাতি, তবু ফেলে দিতে পারে না। পাঁচ তারা বুকে নিয়ে হাঁটা একটা দেশ কখনও হালকা হতে পারে না।

জাপানের বিপক্ষে যেদিন তারা প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েছিল, সেদিন সাও পাওলোর কোনো বারে, রিওর কোনো ফাভেলার ছাদে, নিশ্চয়ই কেউ কেউ চুপ করে গিয়েছিল। সেই পুরনো ভয়টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, যে ভয়ের নাম ২০১৪। কিন্তু কাসেমিরোর মাথায় বল লাগল, তারপর মার্তিনেল্লির পায়ে যোগ করা সময়ের সেই গোল। আর সাও পাওলোর বারে, রিওর ছাদে আবার শুরু হলো উৎসব। ভয় আর উৎসবের এই দোলাচলেই বেঁচে থাকে ব্রাজিলের ফুটবল, প্রতিটা ম্যাচেই যেন নতুন করে প্রমাণ করতে হয়, আমরা এখনও সেই আমরাই।

রবিবার বিকেলে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তাই মুখোমুখি হবে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন স্মৃতি। একদিকে এক জাতি, যার কাছে জেতা মানে অভ্যাস, হারা মানে বিপর্যয়। অন্যদিকে আরেক জাতি, যার কাছে এতদূর আসাটাই এক ধরনের জয়, আর এরপর যা কিছু হবে, সবটাই বোনাস। এমন এক অসম মনস্তত্ত্বের লড়াইয়ে কে এগিয়ে, তা বলা কঠিন। কারণ ইতিহাস বলে, ভারমুক্ত মানুষ কখনও কখনও ভারগ্রস্তকে হারিয়ে দেয় নিছক নির্ভারতার জোরেই।

আর ইতিহাস তো নীরব থাকেনি এই দুই দলের মাঝে। সব মিলিয়ে এই দুই দল এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে মোটে চারবার, আর তার হিসেব বলছে- নরওয়ে দুবার জিতেছে, দুবার ড্র করেছে, ব্রাজিল একবারও জেতেনি। ছোট এই সংখ্যাটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। যে দলটা আজ আন্ডারডগ হিসেবে মাঠে নামবে, ইতিহাসের পাল্লা আসলে তাদের দিকেই ভারি।

১৯৯৮ সালে, যখন ব্রাজিল রোনালদোকে নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর, তখন গ্রুপ পর্বের এক সন্ধ্যায় এক অখ্যাত নরওয়ে এসে সেই স্বপ্নের মাঝে হঠাৎ একটা ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিল, ২-১ গোলের এক অঘটনে। যদিও সেই ধাক্কা ব্রাজিলকে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে আটকাতে পারেনি।

সেই ম্যাচের কথা আজ ব্রাজিলের নতুন প্রজন্ম হয়তো জানেই না, কিন্তু নরওয়ের পুরনো প্রজন্মের কাছে সেই সন্ধ্যা এখনও একটা রূপকথা। বাবার কাছ থেকে ছেলেতে বাহিত হওয়া এক অহংকারের গল্প। আটাশ বছর পর সেই গল্প আবার ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে, ঠিক যখন প্রতিশোধের চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস কি নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে, নাকি প্রতিটা প্রজন্ম নিজের মতো করে ইতিহাস লেখে?

ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পায়ে বল এলে মনে হয়, সময়টা যেন থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য পুরো গ্যালারি নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখে, জানে না পরের সেকেন্ডে কী ঘটবে। এই টুর্নামেন্টে চার গোল করা এই ছেলেটা যেন প্রতিটা ম্যাচেই প্রমাণ করতে চায়, রিওর রাস্তায় বল নিয়ে দৌড়ানো সেই কিশোরটা আজও বেঁচে আছে তার ভেতরে। তার পাশে মাথেউস কুনিয়া, নিজের নীরব দক্ষতায় যেন বলতে চান, তারকা হওয়ার জন্য চিৎকার করার দরকার নেই। কিন্তু নরওয়ের রক্ষণ যদি একবারও হালান্ডের সেই একাগ্রতার সামনে হাঁটু কাঁপায়, তবে গোটা পরিকল্পনা ভেঙে পড়তে পারে তাসের ঘরের মতো। কারণ হালান্ড শুধু একজন স্ট্রাইকার নন, তিনি একটা জাতির জমে থাকা সব হতাশার প্রতিশোধ, বল জালে জড়ানোর প্রতিটা মুহূর্তে যিনি যেন বলে ওঠেন, আমরা আর কারো ছায়া নই।

আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে এই ম্যাচের আসল উত্তেজনা। ব্রাজিলের রক্ষণ পরিসংখ্যানে মজবুত, কিন্তু জাপান ম্যাচের চল্লিশ মিনিট মনে করিয়ে দেয়, কাগজের হিসেব মাঠে সবসময় খাটে না। নরওয়ে চার ম্যাচে দশ গোল করেছে ঠিকই, কিন্তু আট গোল হজম করে বলে দিয়েছে, তাদের রক্ষণ এখনও শিখছে বড় মঞ্চের ভাষা। দুটো দলই যেন একে অপরের আয়না।

একদল আক্রমণে অতুলনীয় কিন্তু রক্ষণে ভঙ্গুর, আরেক দল রক্ষণে ভরসাযোগ্য কিন্তু চাপে পড়লেই কাঁপে। এমন দুই আয়নার সংঘর্ষে গোল না হয়ে উপায় নেই, যদি না নিউ জার্সির সেই তীব্র গরম। যা রবিবার নব্বইয়ের ঘর ছুঁতে পারে বলে পূর্বাভাস। দুই দলকেই বাধ্য করে পা টেনে টেনে খেলতে।

বাজিকরদের অঙ্কে ব্রাজিল স্পষ্ট ফেভারিট, নরওয়ে আন্ডারডগ। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, আন্ডারডগ শব্দটার আসল অর্থ কখনও হার নয়। তার আসল অর্থ হলো, হারানোর কিছু নেই বলে সব হারানোর ভয়হীন এক দুঃসাহস।

মেটলাইফের গ্যালারিতে রবিবার তাই একসঙ্গে বসে থাকবে দুটো ভিন্ন সত্য, একটা জাতির পাঁচ তারার ভার, আর আরেকটা জাতির আটাশ বছরের প্রতীক্ষা ভাঙার উৎসব। বল গড়ানোর আগে কেউ জানে না, শেষ পর্যন্ত কোন স্মৃতিটা জিতবে। শুধু এটুকু নিশ্চিত, রবিবার বিকেলে যা কিছু ঘটবে, তা মনে রাখার মতো একটা অধ্যায় হয়েই থাকবে। জয়ীর ইতিহাসে হোক বা পরাজিতের রূপকথায়।

খেলাধুলা