111
Sharesএকটা মুকুট পরার পর মানুষ কখনও কখনও
ভুলে যায়, মুকুট মাথায় নিয়ে হাঁটাটাও একটা লড়াই। ২০১০ সালের জোহানেসবার্গে যে স্পেন
প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছিল, সেই স্পেন এরপর ষোলো বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে
সেই স্বাদটা আবার।
আশ্চর্যের বিষয়, ২০০৬, ২০১০ আর ২০১৪-র
চ্যাম্পিয়ন ইতালি, স্পেন, জার্মানি কেউই নিজেদের জেতা বিশ্বকাপের পর আর কোনো নকআউট
ম্যাচ জেতেনি। এই এক অদ্ভুত অভিশাপ যেন বিশ্বকাপ-জয়ী দলগুলোর পিছু ছাড়ে না, শিরোপা
যেন এক অদৃশ্য ভার হয়ে বসে থাকে কাঁধে, প্রতিটা দল তাদের পরের প্রজন্মকে মনে করিয়ে
দেয় আমরা তোমাদের চেয়ে বড় কিছু করেছিলাম একদিন।
আজ লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে
সেই অভিশাপ ভাঙার সুযোগ স্পেনের সামনে। প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। যারা এমন এক দল, তাদের
নাম বিশ্বকাপ নকআউটের সাথে শেষবার জুড়েছিল ১৯৫৪ সালে। ৭২ বছরের নির্বাসন ভেঙে তারা
ফিরেছে, আর কীভাবে ফিরেছে সেটাই একটা গল্প।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়ার
বিপক্ষে যখন সবাই ভেবেছিল নিয়মরক্ষার এক ম্যাচ, তখনই নাটক জমে উঠল, ৩-৩ গোলের উত্তেজনায়।
যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে সাসা কালাইডজিচের মাথায় বল লাগল, আর একটা দেশের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন
এক সেকেন্ডের ব্যবধানে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলো। এমন একটা মুহূর্ত মানুষ ভুলতে পারে
না। যেখানে হার আর বেঁচে থাকার মাঝের দূরত্ব একটা হেডারের সমান।
স্পেনের যাত্রাটা কাগজে-কলমে মসৃণ দেখালেও, মাঠে ততটা নিশ্চিন্ত নয়। কেপ ভের্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু, তারপর সৌদি আরবকে চার গোলে বিধ্বস্ত করা, শেষে উরুগুয়ের বিপক্ষে কষ্টেসৃষ্টে এক গোলের জয়। এই পুরো যাত্রায় একটা নাম বারবার ফিরে এসেছে, লামিনে ইয়ামাল।
কিশোর এই ফুটবলার, তার
পায়ে যেন লুকিয়ে আছে গোটা একটা প্রজন্মের প্রত্যাশা। চোট সামলে সামলে খেলছেন, কখনও
১৯ মিনিট, কখনও ৪৫, কখনও ৭৬। স্পেনের আক্রমণ যেন তার ছন্দের সঙ্গে দুলছে, তিনি ভালো
খেললে দল উড়ছে, তিনি নিষ্প্রভ থাকলে দলও যেন হারিয়ে ফেলছে নিজের ভাষা। এত বড় একটা
দলের এতটা নির্ভরতা একটামাত্র কিশোরের পায়ে, এটা যতটা আশীর্বাদ, ততটাই ঝুঁকিও।
আর অস্ট্রিয়া? রাল্ফ র্যাংনিকের
এই দলটা যেন বলে বেড়াচ্ছে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ হারানোর কিছু নেই। উঁচুতে প্রেসিং
করা, গতি আর দক্ষতার মিশেলে ছুটে চলা এই দলটা মেসির আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছে ঠিকই,
কিন্তু হারের ভেতরেও লুকিয়ে ছিল একটা জেদ।
মার্সেল সাবিৎজার, যিনি ক্লাব ফুটবলে
বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জার্সি গায়ে চড়ান। আজ তার কাঁধেই থাকবে দুই দিকের দায়িত্ব,
রক্ষণে স্পেনের ছন্দ ভাঙা, আর আক্রমণে পাল্টা আঘাত হানা। বলে রাখা ভালো, ১৯৮২ সাল থেকে
বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে অস্ট্রিয়া ক্লিন শিট রাখতে পারেনি। বিয়াল্লিশ বছরের
এক অপূর্ণ প্রতীক্ষা, যা আজও চলছে।
তবু ইতিহাস সবসময় সংখ্যার হিসেবে
চলে না। স্পেনের রক্ষণ এই টুর্নামেন্টে এখনও অক্ষত, গ্রুপ পর্বে একটাও গোল হজম করেনি
তারা। কিন্তু নকআউট ফুটবলের নিয়ম আলাদা। একটা ভুল, একটা মুহূর্তের অন্যমনস্কতা, আর
গোটা মৌসুমের পরিশ্রম ভেস্তে যেতে পারে এক নিমেষে।
এই মুহূর্তে নিজের সেরা ছন্দে নেই
রদ্রি, যদি আজও নিষ্প্রভ থাকেন, তবে অস্ট্রিয়ার উঁচু প্রেসিং স্পেনের মাঝমাঠে বিশৃঙ্খলা
তৈরি করতেই পারে। আর তখনই হয়তো লেখা হবে আরেকটা অঘটনের গল্প। যেমন এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে
লেখা হয়ে গেছে জার্মানির বিদায়ের গল্প, যেমন লেখা হয়েছে একের পর এক ফেভারিটের হোঁচট
খাওয়ার গল্প।
আজ রাত ১টায় তাই সোফাই স্টেডিয়ামে
মুখোমুখি হবে দুটো ভিন্ন সময়ের ক্ষুধা। একদিকে এক সাবেক চ্যাম্পিয়ন, যে নিজের পুরনো
গৌরব ফিরে পেতে মরিয়া, কিন্তু নিজের কিশোর তারকার পায়ের ওপর ভর করে হাঁটছে। অন্যদিকে
এক ভুলে যাওয়া দল, ৭২ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে যারা প্রমাণ করতে চায়, ইতিহাস কখনও
কখনও নিজেই নিজেকে নতুন করে লেখে।
ফলাফল যাই হোক, এই ম্যাচ মনে করিয়ে দেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো নাম, কোনো ট্রফি, কোনো ইতিহাসই যথেষ্ট সুরক্ষিত নয়। মাঠে নামলে সবাই সমান, শুধু সেদিনের সাহসটাই আসল হিসেব।
আরসি-০২