107
Sharesরাত সাড়ে দশটা। ঢাকার ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটের
ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার শেষ। টেলিভিশনে খবর চলছে। বাবা মাঝেমধ্যে পর্দার দিকে তাকাচ্ছেন,
মাঝেমধ্যে মোবাইল স্ক্রল করছেন। মা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছেন। ঘরের আরেক পাশে নিজের
রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রনি। তার বয়স তেইশ। দেশের অন্যতম নামকরা একটি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ইংরেজিতে সাবলীল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাবে যুক্ত। বন্ধুদের
সঙ্গে স্টার্টআপ নিয়ে আলোচনা করে। লিংকডইনে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের সাফল্যের গল্প
পড়ে।
আজ তার দরকার মাত্র তিন হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাইরে একটি পেশাগত প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হচ্ছে। কোর্সটি করলে সিভিতে একটা নতুন সার্টিফিকেট
যোগ হবে। ভবিষ্যতে হয়তো কোনো চাকরির ইন্টারভিউতে কাজে লাগবে।
টাকাটা খুব বেশি নয়। সমস্যাটাও টাকা নয়।
সমস্যা হলো, এই বয়সেও তাকে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে, ‘আব্বু, তিন হাজার টাকা
লাগবে।’ সে জানে, বাবা টাকা দেবেন। কিন্তু তার আগে কিছু প্রশ্নও করবেন।
‘গত মাসেও তো নিয়েছিলে?’
‘এত খরচ কীসের?’
‘তোমাদের তো বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব শেখায়!’
রনি কোনো উত্তর দেয় না। কারণ সে জানে, আসল
উত্তরটা অন্য। গত এক বছরে পাঁচটি পার্ট-টাইম চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। একটি কফিশপ।
একটি স্পোর্টস মিডিয়া। একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি। একটি বুকশপে। একটি স্টার্টআপ।
সব জায়গায় একই প্রশ্ন। ‘সকাল নয়টা থেকে
বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করতে পারবেন?’
সে পারেনি। কারণ ঠিক ওই সময়েই তার ক্লাস,
ল্যাব, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ ওয়ার্ক।
বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বলেছে, ‘ভালো ছাত্র হও।’
চাকরির বাজার বলেছে, ‘অভিজ্ঞ কর্মী হও।’ কিন্তু অভিজ্ঞ হওয়ার জন্য যে কাজ করতে হয়,
সেই সময়টাই তার বিশ্ববিদ্যালয় কেড়ে নিয়েছে।
প্রায় তিনশ কিলোমিটার দূরে, সিলেটের উপকণ্ঠে
আরেকটি গল্প চলছে। নাঈম একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল
পড়ছে। এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস ছিল। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, ছেলেটা অনেক দূর যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস সবকিছু ঠিকই ছিল। তারপর শুরু হলো
বাস্তবতা। প্রতিদিন বাসা থেকে টাকা চাইতে তার অস্বস্তি হতে লাগল। সে সিদ্ধান্ত নিল,
নিজেই কিছু করবে। সকালে ক্লাস। দুপুরে ল্যাব। সন্ধ্যায় দুটি টিউশনি। রাতে একটি ছোট
প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ পরিচালনার কাজ।
দিনের শেষে যখন বাসায় ফিরত, তখন আর বই খোলার
শক্তি থাকত না। দ্বিতীয় বর্ষ শেষে তার সিজিপিএ নেমে এলো। তৃতীয় বর্ষে সেটি তিনের
নিচে চলে গেল। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার ফল এত খারাপ
কেন?’
নাঈম মাথা নিচু করেছিল। সে বলতে পারেনি, ‘স্যার,
আমি খারাপ ছাত্র নই। আমি শুধু সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।’
আরিফের গল্প আরও অদ্ভুত। সে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। ফল ভালো। ইংরেজি জানে। বিতর্ক করেছে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে
কাজ করেছে। প্রথম চাকরির ইন্টারভিউতে সে আত্মবিশ্বাসী ছিল। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।
শেষে এইচআর ম্যানেজার হাসিমুখে বললেন, ‘আপনার তো কোনো করপোরেট এক্সপেরিয়েন্স নেই।’
আরিফ বাসায় ফিরে প্রথমবারের মতো নিজের বিশ্ববিদ্যালয়
জীবনের কথা ভাবল। চার বছরে সে কতবার সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ক্লাস করেছে।
কতবার পরীক্ষা দিয়েছে। কতবার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছে। কিন্তু একবারও কি কেউ তাকে
বলেছিল, ‘চলো, তোমাকে একটি প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস কাজ শিখিয়ে আনি?’
না। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিগ্রি দিয়েছে।
অভিজ্ঞতা দেয়নি। চাকরির বাজার তার কাছে অভিজ্ঞতা চেয়েছে। ডিগ্রি দেখেনি।
রনি, নাঈম কিংবা আরিফ। তিনটি নামই কাল্পনিক।
কিন্তু তাদের গল্প নয়। বাংলাদেশের লাখো লাখো তরুণের জীবন থেকে নেওয়া বাস্তবতার মিশ্রণ
এগুলো। আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে একজন তরুণকে প্রথমে বলা হয়, 'পড়াশোনার সময়
শুধু পড়ো।' তারপর বলা হয়, ‘অভিজ্ঞতা কোথায়?’ এই দুই বাক্যের মাঝখানেই আটকে আছে বাংলাদেশের
লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ।
এক যুগ আগে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আজকের
এই দিনটি, অর্থাৎ ১৫ জুলাই, বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। প্রতি বছর
এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুধু দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয় না, আলোচনা হয়
কীভাবে একজন তরুণকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা যায়, তা নিয়েও। বাংলাদেশেও আলোচনা
হয়। সেমিনার হয়, সংলাপ হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বের হওয়ার
পরও কেন একজন তরুণ চাকরির বাজারে নিজেকে এত অসহায় মনে করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা
খুব কমই খুঁজি। আমরা বেকারত্ব নিয়ে কথা বলি। কিন্তু কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা নিয়ে
খুব কম কথা বলি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে
দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৪ হাজার, জাতীয় বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ।
কিন্তু অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, প্রকৃত বেকার ও অনুপার্জনশীল মানুষের সংখ্যা এর
চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। আর এই বেকারদের একটা বড় অংশ, প্রায় ৩১.৫
শতাংশ, স্নাতক বা তার চেয়েও উচ্চ শিক্ষিত। অর্থাৎ পড়াশোনা শেষ করার পরও একটা বিশাল
অংশ দীর্ঘদিন চাকরি ছাড়া বসে থাকে।
কেন এই দশা? রাজশাহী শহরের শিক্ষার্থীদের
নিয়ে করা একটা গবেষণা (২০২৫) বলছে, উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক পার্ট-টাইম
কাজের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। যে শিক্ষার্থীরা কাজ করছে, তাদের বড় অংশ নির্ভর করছে টিউশনি
(১৮%), সুপারশপ সহকারী (১৮%), ফুড ডেলিভারি (৯%) বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের (১১%) মতো অনানুষ্ঠানিক
পথে।
আর যারা এসব কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে,
সময় ব্যবস্থাপনার সংকটে তাদের সিজিপিএ গড়ে ১৫.২৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিবিএসের
তথ্য বলছে, পাস করার পর ১৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট দুই বছরের বেশি সময় বেকার বসে থাকে,
মূলত পড়াশোনার সাথে করপোরেট বাজারের চাহিদার অমিল আর ইন্টার্নশিপের সুযোগ না থাকার
কারণে।
তবে আরও উদ্বেগের বিষয় অন্য জায়গায়। আন্তর্জাতিক
শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বাংলাদেশের যুব বেকারত্বের হার ১৬.৮ শতাংশ। আরও প্রায় ৩০.৯
শতাংশ তরুণ-তরুণী এমন অবস্থায় আছে, যারা না চাকরিতে, না শিক্ষায়, না কোনো প্রশিক্ষণে
যুক্ত। বিশেষ করে তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এগুলো
ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের হিসাব। অপেক্ষায় থাকা পরিবারের হিসাব। অসংখ্য অসমাপ্ত স্বপ্নের
হিসাব।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই হবে তরুণ। অর্থাৎ এই প্রজন্মের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান
তৈরি করতে না পারলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক
খাতে, যেখানে কম মজুরি, কম উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি বড় সমস্যা।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু চাকরি নেই, তা নয়। সমস্যা
হলো, যে চাকরি আছে, তার বড় অংশই এমন নয়, যা একজন শিক্ষিত তরুণের দক্ষতা ও সম্ভাবনার
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমাদের তরুণরা অলস হয়ে গেছে।’ ‘তারা শুধু
সরকারি চাকরি চায়।’ ‘তাদের দক্ষতা নেই।’
কিন্তু আমরা খুব কমই নিজেদের আরেকটি প্রশ্ন
করি। আমরা কি সত্যিই তাদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করেছি? নাকি আমরা এমন একটি ব্যবস্থা
তৈরি করেছি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে, শিল্পখাত আরেকদিকে, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে
আছে বিভ্রান্ত এক তরুণ?
বিশ্ববিদ্যালয় আর কর্মক্ষেত্রের মাঝখানে
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি অদৃশ্য দেয়াল আছে। দেয়ালটি ইট-পাথরের নয়। এর নাম অভিজ্ঞতা।
আজ দেশের প্রায় প্রতিটি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে চোখ বুলালেই একই শব্দ বারবার ফিরে আসে।
‘Minimum one year experience.’ ‘Freshers are discouraged.’ ‘Previous corporate
experience preferred.’
অথচ প্রশ্ন হলো, এই এক বছরের অভিজ্ঞতা একজন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কোথায় পাবে? ক্লাসরুমে? পরীক্ষার খাতায়? নাকি সেই ইন্টার্নশিপে,
যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান আট ঘণ্টার কাজ করিয়ে মাস শেষে এক টাকাও দেয় না?
এ যেন এমন এক খেলার নিয়ম, যেখানে মাঠে নামার
আগেই খেলোয়াড়কে বলা হচ্ছে, ‘আগে গোল করে দেখাও, তারপর তোমাকে খেলতে দেব।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মানুষকে
কেবল ডিগ্রি দেওয়ার জন্য নয়। সমাজের জন্য প্রস্তুত করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের
অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এমন এক শিক্ষা কাঠামো অনুসরণ করে, যেখানে শিক্ষার্থীর
সাফল্য নির্ধারণ হয় মূলত পরীক্ষার নম্বর, সিজিপিএ আর উপস্থিতির হিসাব দিয়ে। কর্মজীবনের
প্রস্তুতি সেখানে অনেকটাই ব্যক্তিগত দায়িত্ব।
এই বিচ্ছিন্নতাকেই অর্থনীতিবিদরা বলেন
University-Industry Gap। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় যা শেখাচ্ছে, শিল্পখাত তার সবটা চাইছে
না। আবার শিল্পখাত যা চাইছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও সবসময় তা শেখাতে পারছে না।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, আর্থিক
খাত কিংবা সৃজনশীল অর্থনীতির অনেক নিয়োগদাতা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করছেন, নতুন গ্র্যাজুয়েটদের
একটি অংশের তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা
সমাধানের সক্ষমতা কিংবা দলগতভাবে কাজ করার প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশ্নও অযৌক্তিক
নয়। তারা বলে, চার বছরের ডিগ্রি কোর্স কি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হতে
পারে? এই দুই পক্ষের বিতর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে একজন শিক্ষার্থী। সে জানেই না,
কার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।
এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। কিন্তু পার্থক্য
হলো, অনেক দেশ এই সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি করেছে। জার্মানির Dual Education
System-এ একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ এবং কর্মক্ষেত্রে শেখে। সুইজারল্যান্ড,
অস্ট্রিয়া এবং ডেনমার্কেও একই ধরনের শিক্ষানবিশ (Apprenticeship) ব্যবস্থা বহু বছর
ধরে সফলভাবে চলছে।
কানাডার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে
Co-operative Education (Co-op) প্রোগ্রাম রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার অংশ
হিসেবেই বেতনভিত্তিক চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যুক্তরাজ্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে
Placement Year এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনের অংশ।
এ কারণেই সেখানকার একজন নতুন গ্র্যাজুয়েটের
সিভিতে প্রায়ই লেখা থাকে, Customer Assistant. Research Intern. Library
Assistant. Student Ambassador. Teaching Assistant. এই পদগুলো ছোট হতে পারে। কিন্তু
এগুলোই প্রথম দরজা খুলে দেয়।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় ছাত্রছাত্রীরা
সেমিস্টার চলাকালীন সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে পারে, ঘণ্টায় ন্যূনতম মজুরিও
নির্দিষ্ট হারে বাঁধা। কানাডায় সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজের অনুমতি, জার্মানিতে ‘১৪০ দিনের
নিয়ম’ চালু আছে, আর যুক্তরাজ্যে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করে একজন শিক্ষার্থী মাসে লক্ষাধিক
টাকার সমমূল্য আয় করতে পারে। আর তার সাথে থাকে কারিকুলাম প্র্যাক্টিক্যাল ট্রেনিং
বা অপশনাল প্র্যাক্টিক্যাল ট্রেনিংয়ের মতো ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে স্নাতক শেষ করার
আগেই একজন শিক্ষার্থীর ঝুলিতে চলে আসে এক-দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশেও কি সেটা সম্ভব?
অবশ্যই সম্ভব। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন
এখনো সম্ভব হয়নি? দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। বিশাল
লাইব্রেরি আছে। কম্পিউটার ল্যাব আছে। রিসার্চ সেল আছে। আইটি বিভাগ আছে। প্রশাসনিক অফিস
আছে। ক্যারিয়ার সেন্টারও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে।
কিন্তু এসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত
বেতনভিত্তিক Student Assistant বা Campus Employment-এর ব্যবস্থা কতটুকু? খুবই সীমিত।
অথচ এগুলো চালু করতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
লাগে না। লাগে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এই জায়গায় এসে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। ছাত্র
সংসদগুলো কোথায়?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে
দীর্ঘ বিরতির পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ একটি কার্যকর
ছাত্র সংসদ কেবল নির্বাচন জেতার জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার প্রতিনিধিত্ব
করার জন্য। কিন্তু একটি সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কী? হলের সিট?
টিউশন ফি? নিরাপত্তা?
হ্যাঁ। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও
ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার আগেই আমি কীভাবে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত
হব? দুঃখজনকভাবে এই প্রশ্নটি খুব কমই ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রীয় এজেন্ডা হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসে
স্টুডেন্ট জব। পেইড ইন্টার্নশিপ। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত অংশীদারত্ব। ক্যারিয়ার সার্ভিস
শক্তিশালী করা। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ। এসব বিষয় নিয়ে
ধারাবাহিক আন্দোলন বা নীতিগত দাবির উদাহরণ খুব বেশি দেখা যায় না।
অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্ররাজনীতি জাতীয় রাজনৈতিক
প্রশ্নে বেশি সক্রিয় থাকে, কিন্তু একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর কর্মজীবনের বাস্তব সংকট
তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যায়। এটি কোনো একক সংগঠনের সমালোচনা নয়। এটি আমাদের ছাত্ররাজনীতির
অগ্রাধিকারের একটি প্রশ্ন। কারণ একটি ছাত্র সংসদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত,
সে কতজন ভবিষ্যৎ নেতা তৈরি করল, তার চেয়ে বেশি, সে কতজন সাধারণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে
একটু সহজ করতে পারল।
আরও একটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে, যেটি আমরা খুব
কম আলোচনা করি। এর নাম Degree Inflation। বিশ বছর আগে যে চাকরিতে উচ্চমাধ্যমিক পাস
করলেই চলত, আজ সেখানে স্নাতক চাওয়া হয়। যেখানে আগে স্নাতক যথেষ্ট ছিল, এখন সেখানে
মাস্টার্স। অনেক ক্ষেত্রে কাজের ধরন খুব একটা বদলায়নি। বদলেছে শুধু প্রবেশের শর্ত।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটাচ্ছে, আরও বেশি টাকা ব্যয়
করছে, কিন্তু শ্রমবাজারে তাদের অবস্থান আগের মতোই অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বাড়ছে Credentialism। অর্থাৎ দক্ষতার
চেয়ে সার্টিফিকেটের সংখ্যা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। একজন তরুণের সিভিতে পাঁচটি
সার্টিফিকেট থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ হয়তো কখনোই
পায়নি। আমরা তাকে কাগজে যোগ্য বানাচ্ছি। কর্মজীবনে নয়।
একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। রনি, নাঈম কিংবা
আরিফের মতো তরুণরা কি সত্যিই প্রস্তুত নয়? নাকি আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছি,
যেখানে তাদের প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই দেওয়া হয় না? হয়তো উত্তরটা এই দুইয়ের মাঝখানেই
কোথাও।
অনেক চেষ্টার পর কেউ যদি চাকরি পেয়েও যায়,
তবুও কিন্তু তার আনন্দটা বেশিদিন টেকে না। প্রথম মাসের শেষে রনি বুঝতে পারে, চাকরি
পাওয়া আর স্বাবলম্বী হওয়া এক জিনিস নয়। বেতন ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যে যাতায়াত,
মোবাইল, ইন্টারনেট, দুপুরের খাবার, কখনো সহকর্মীর জন্মদিন, কখনো অসুস্থ মা, কখনো ছোট
ভাইয়ের বই।
মাস শেষ হতে না হতেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রায়
শূন্য। অফিস সকাল নয়টায়। বের হতে হতে রাত আটটা। নিয়োগপত্রে লেখা ছিল বিকেল পাঁচটা।
বাস্তবে পাঁচটার পরে আরেকটা অফিস শুরু হয়। সেই সময়ের কোনো ওভারটাইম নেই। কোনো অতিরিক্ত
ছুটি নেই। কোনো অভিযোগ করার জায়গাও নেই। কারণ বাইরে অপেক্ষা করছে আরও একশো সিভি।
বাংলাদেশে নতুন চাকরিজীবীদের অনেকের কাছেই
এটি পরিচিত গল্প। শুধু কম বেতন নয়। বরং এমন একটি কর্মসংস্কৃতি, যেখানে তরুণদের শেখানো
হয়, ‘এখন কষ্ট করো। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু সেই ‘পরে’ কবে আসে? সবাই জানে না।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর
একটি এখানেই। একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো বলে, ‘দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না।’ অন্যদিকে তরুণরা
বলে, ‘সুযোগই তো পাই না।’
দুই পক্ষই আংশিক সত্য বলছে। কিন্তু মাঝখানে
হারছে দেশ। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরেই একটি বিষয় উল্লেখ করে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি
প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, দারিদ্র্য কমেছে, অবকাঠামো বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উচ্চ
উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কর্মসংস্থান যথেষ্ট বাড়েনি। অর্থাৎ শুধু জিডিপি বাড়লেই হবে
না। কাজের মানও বাড়তে হবে। নইলে প্রবৃদ্ধির সুফল তরুণদের কাছে পৌঁছায় না। এ কারণেই
আজ একটি নতুন শব্দ অর্থনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Brain Waste. আমরা সবাই Brain Drain শব্দটি
জানি। মেধাবীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তার আগের গল্পটি নিয়ে খুব কম কথা হয়। একজন
তরুণ চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল। আরও এক বছর মাস্টার্স করল, ইংরেজি শিখল, প্রোগ্রামিং
শিখল, ডিজাইন শিখল, গবেষণা করল। তারপর পাঁচ বছর এমন একটি কাজে আটকে রইল, যেখানে তার
সেই দক্ষতার খুব সামান্যই ব্যবহার হলো।
সে দেশে আছে। কিন্তু তার মেধা ব্যবহৃত হচ্ছে
না। এটাই Brain Waste। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। কারণ একজন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষক, রাষ্ট্র, করদাতার অর্থ, অবকাঠামো,
সময়, সব মিলিয়ে বিশাল বিনিয়োগ হয়। যখন সেই মানুষটির সক্ষমতা কাজে লাগে না, তখন
ক্ষতিটা পুরো সমাজের।
তারপর একদিন সেই তরুণ সিদ্ধান্ত নেয়। কানাডা,
অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য। কেউ স্কলারশিপ নিয়ে যায়, কেউ স্টুডেন্ট ভিসায়,
কেউ কাজের ভিসায়। আমরা তখন বলি, ‘ব্রেন ড্রেন হচ্ছে।’
কিন্তু খুব কমই জিজ্ঞেস করি, কেন হচ্ছে? সবাই
কি শুধু বেশি বেতনের জন্য দেশ ছাড়ে? নাকি এমন একটি সমাজের জন্য, যেখানে তার শ্রমের
মূল্য আছে? যেখানে প্রথম চাকরির জন্য পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা লাগে না? যেখানে ইন্টার্নশিপ
মানে বিনা বেতনের শ্রম নয়? যেখানে বস সময়মতো অফিস ছাড়লে তাকেও দুর্বল ভাবা হয় না?
এখানে একটি ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। বিদেশ মানেই
স্বর্গ নয়। জার্মানিতে কাজ করতে হয়, কানাডায়ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, অস্ট্রেলিয়ায়ও
প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু একটি বড় পার্থক্য আছে। সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে শ্রমবাজারের
অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
বাংলাদেশে অনেক সময় শিক্ষার্থী আর কর্মীকে
দুটি আলাদা পরিচয় হিসেবে দেখা হয়। যেন একজন মানুষ একই সঙ্গে পড়তেও পারে না, কাজও
করতে পারে না। এ কারণেই উন্নত বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে Earn While You Learn শুধু
একটি স্লোগান নয়।
এটি একটি নীতি। জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
শিক্ষার্থীরা গবেষণা সহকারী, লাইব্রেরি সহকারী, ল্যাব সহকারী কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে
খণ্ডকালীন কাজ করেন। কানাডায় Co-op Education বহু ডিগ্রি প্রোগ্রামের বাধ্যতামূলক
অংশ। ফিনল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প পরিচালনা করে। নেদারল্যান্ডসে
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় বাস্তব প্রকল্পে যুক্ত হয়। ফলে স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই
তাদের সিভিতে একাধিক বাস্তব অভিজ্ঞতা যোগ হয়।
বাংলাদেশে কি এটি অসম্ভব? একেবারেই নয়। বরং
আমাদের সুবিধা আরও বেশি। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী বিশাল। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা দ্রুত
শেখে, ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমশক্তি তৈরি করেছে।
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ধীরে ধীরে বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
অর্থাৎ সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে
সেতুর। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সেতুর। ডিগ্রি থেকে দক্ষতায় যাওয়ার
সেতুর। স্বপ্ন থেকে বাস্তবে যাওয়ার সেতুর। হয়তো সমস্যাটা চাকরির সংখ্যার চেয়েও বড়।
হয়তো সমস্যাটা হলো, আমরা এখনো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে একজন তরুণ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই জানে, চার বছর পরে তার জন্য একটি পথ
অপেক্ষা করছে।
আজ সে পথের বদলে অপেক্ষা করছে একটি প্রশ্ন।
‘আপনার অভিজ্ঞতা কত?’ আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ
তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বছরগুলো কাটিয়ে দিচ্ছে।
সমস্যার কথা বলা সহজ। সমাধানের কথা বলা কঠিন।
কারণ কর্মসংস্থান শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়। বেসরকারি শিল্পখাতের বিষয়।
এমনকি ছাত্র সংসদেরও বিষয়।
আমরা প্রায়ই কর্মসংস্থানকে শুধু চাকরির সংখ্যা
দিয়ে মাপি। কিন্তু একটি দেশের কর্মসংস্থান নীতির আসল শক্তি বোঝা যায় অন্য একটি প্রশ্নে।
একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই কি জানে, এই চার বছর তাকে কোথায়
নিয়ে যাবে?
বাংলাদেশে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই প্রশ্নের
উত্তর জানে না। তারা জানে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়, কীভাবে সিজিপিএ ধরে রাখতে
হয়, কীভাবে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে হয়।
কিন্তু খুব কম শিক্ষার্থী জানে, কীভাবে কর্মজীবনের
জন্য নিজেকে ধাপে ধাপে তৈরি করতে হয়। কারণ সেই পথটি এখনো প্রতিষ্ঠানগতভাবে তৈরি হয়নি।
এই পরিবর্তন শুরু হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই কিছু সুপারিশ
করে আসছেন— বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
সান্ধ্যকালীন বা নমনীয় শিফট চালু করা, বাধ্যতামূলক পেইড ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করা,
আর যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের পার্ট-টাইম নিয়োগ দেয় তাদের কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা
দেওয়া। এসব প্রস্তাব কাগজে আছে বহুদিন। বাস্তবে নামতে বাকি।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক
Career Development Centre থাকতে পারে, যা শুধু সেমিনার আয়োজন করবে না, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান,
সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তি কোম্পানি, ব্যাংক, হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপগুলোর
সঙ্গে নিয়মিত অংশীদারত্ব গড়ে তুলবে। চতুর্থ বর্ষে এসে নয়। প্রথম বর্ষ থেকেই। শিক্ষার্থীরা
যেন অন্তত বছরে একবার বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পায়। দ্বিতীয় পরিবর্তনটি
হতে পারে Paid Internship।
বাংলাদেশে ‘ইন্টার্নশিপ’ শব্দটি অনেক সময়
একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার নাম। কোথাও তিন মাস। কোথাও ছয় মাস। কোথাও প্রতিদিন আট ঘণ্টা
কাজ। কিন্তু মাস শেষে কোনো পারিশ্রমিক নেই। এটি ইন্টার্নশিপ নয়। এটি শিক্ষার নামে
শ্রমের অবমূল্যায়ন। একজন শিক্ষার্থীর সময়েরও মূল্য আছে। শ্রমেরও মূল্য আছে। অভিজ্ঞতা
অর্জন কখনোই বিনা মূল্যের শ্রমের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
তৃতীয় পরিবর্তনটি হতে পারে Campus
Employment। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, রেজিস্ট্রার অফিস, আইটি সাপোর্ট,
ভর্তি কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক অফিস, গবেষণা প্রকল্প।
কেন এসব জায়গায় শিক্ষার্থীরা খণ্ডকালীন
কাজ করতে পারবে না? যে কাজ একজন শিক্ষার্থী আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখবে, আগামীকাল সেটিই
তার প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াবে। জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়
এটি নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও এটি অসম্ভব নয়।
চতুর্থ পরিবর্তনটি সবচেয়ে কঠিন। এটি মানসিকতার
পরিবর্তন। আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো নতুন কর্মী খোঁজে, কিন্তু নতুন মানুষ গড়তে
চায় না। তারা অভিজ্ঞ কর্মী চায়। কিন্তু কেউ প্রথম সুযোগ দিতে চায় না। এই সংস্কৃতি
পরিবর্তন না হলে দশ বছর পরও একই অভিযোগ শোনা যাবে। ‘যোগ্য মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না।’
প্রশ্ন হলো, যোগ্য মানুষ তৈরি করবে কে? এখানে
রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি করপোরেট বাংলাদেশেরও আছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থীদের পার্ট-টাইম কাজ, শিক্ষানবিশ বা পেইড ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেবে, তাদের
জন্য কর-প্রণোদনা, স্বীকৃতি কিংবা বিশেষ সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি ব্যয় নয়।
এটি বিনিয়োগ। কারণ আজকের ইন্টার্নই পাঁচ বছর পর সেই প্রতিষ্ঠানের দক্ষ কর্মকর্তা হতে
পারে।
আর ছাত্র সংসদ? এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার
সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গণতন্ত্রের অনুশীলন। নেতৃত্ব তৈরির বিদ্যালয়।
কিন্তু সেই নেতৃত্বের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোকে
প্রতিষ্ঠানের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।
আজ একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কী?
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে সে কোথায় দাঁড়াবে। কীভাবে কাজ শিখবে। কীভাবে প্রথম চাকরি
পাবে। তাহলে এই প্রশ্নগুলো কি ছাত্র সংসদের নির্বাচনী ইশতেহারের কেন্দ্রে থাকা উচিত
নয়? ক্যাম্পাসে স্টুডেন্ট জবের দাবি, পেইড ইন্টার্নশিপের দাবি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের
সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারত্বের দাবি, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের দাবি।
এসব কি শিক্ষার্থীর মৌলিক স্বার্থের অংশ নয়?
জাতীয় রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে তার ভবিষ্যৎ
কর্মজীবনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে ছাত্ররাজনীতি একজন শিক্ষার্থীর চাকরির পথ সহজ করতে
পারে না, সে ছাত্ররাজনীতিকে অন্তত এই প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়
সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বাক্যটি বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু সম্পদ নিজে নিজে সম্পদ
হয়ে ওঠে না। তার জন্য বিনিয়োগ লাগে, পরিকল্পনা লাগে, সুযোগ লাগে। একজন তরুণকে যদি
আমরা শুধু ডিগ্রি দিই, কিন্তু দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না দিই, তবে আমরা জনসংখ্যা পাই,
জনশক্তি পাই না।
লেখার শুরুতে রনির কথা বলেছিলাম। মনে আছে?
রাত সাড়ে দশটায় সে বাবার কাছে তিন হাজার টাকা চাইতে দ্বিধা করছিল। আমি জানি না, রনির
চাকরি কবে হবে। নাঈমের সিজিপিএ আবার বাড়বে কি না, তাও জানি না। আরিফের সিভির পাশে
একদিন ‘Experience’ শব্দটি যোগ হবে কি না, সেটিও জানি না।
কিন্তু আমি জানি, এই দেশে তাদের মতো লক্ষ
লক্ষ তরুণ আছে। তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কিন্তু হতাশার ভাষা একই।
হয়তো কয়েক বছর পর কোনো এক সন্ধ্যায় রনি
সত্যিই প্রথম বেতন হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরবে। বাজার থেকে বাবার জন্য একটি সাদা পাঞ্জাবি
কিনবে। মায়ের জন্য একটি শাড়ি। বাড়িতে ঢুকে হয়তো খুব বেশি কথা বলবে না। শুধু ব্যাগটা
বাড়িয়ে দেবে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, ‘এসব কী?’ রনি হয়তো হেসে বলবে, ‘প্রথম
বেতন।’
সেদিন বাবা হয়তো আবারও চুপ করে থাকবেন। কারণ
বাবারা অনেক সময় আনন্দেও কাঁদতে পারেন না। শুধু চোখের কোণে চশমাটা একটু ঠিক করে নেন।
আমরা প্রায়ই উন্নয়নের গল্প বলি। মেট্রোরেলের
গল্প, পদ্মা সেতুর গল্প, এক্সপ্রেসওয়ের গল্প। এসব অবশ্যই উন্নয়নের গল্প। কিন্তু উন্নয়নের
আরেকটি দৃশ্য আছে। সেটি কোনো উদ্বোধনী মঞ্চে দেখা যায় না। সেটি দেখা যায় একটি সাধারণ
পরিবারের ডাইনিং টেবিলে।
যেদিন একটি ছেলে বা একটি মেয়ে প্রথমবার নিজের
উপার্জনের টাকা দিয়ে সংসারের বাজার করে। যেদিন বাবা-মায়ের কাছে হাত পেতে নয়, তাদের
হাতে কিছু তুলে দিতে পারে। সেদিন শুধু একটি পরিবারের অবস্থাই বদলায় না।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নও সেদিন নতুন অর্থ
পায়। বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আমাদের তাই শুধু বেকারত্বের হার গণনা করতে শেখায় না।
এটি আমাদের একটি আয়নার সামনে দাঁড় করায়। সেখানে প্রশ্নটি খুব সরল। আমরা কি এমন একটি
বাংলাদেশ গড়ছি, যেখানে একজন তরুণের প্রথম চাকরি ভাগ্যের পুরস্কার নয়, শিক্ষাজীবনের
স্বাভাবিক পরিণতি?
যদি সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্প এখনো অসম্পূর্ণ।
লেখক
গণমাধ্যমকর্মী