2
Sharesমধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের পরাজয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাস গোপন করেনি ইরান। স্পিকার থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, এমনকি বিভিন্ন দেশে থাকা দূতাবাসগুলোও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সেগুলোর মূল কথা হলো- মার্কিন নাগরিকরা ট্রাম্পের যুদ্ধের পদক্ষেপকে ‘না’ বলেছেন এবং ওয়াশিংটনের কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর বার্তাটি দিয়েছে ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস। তারা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, হোয়াইট হাউসের কর্মীরা অচেতন ট্রাম্পকে একটি ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছেন। যাতে লেখা- ‘বিপজ্জনক বর্জ্য’।
ইরানের জন্য উদযাপনের সবচেয়ে বড় কারণটি সম্ভবত কৌশলগত সফলতার। ট্রাম্প তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছিলেন। অথচ, নিজের দেশেই রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলো। অন্যদিকে যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও টিকে থাকার কৌশলটি কাজ করেছে।
‘স্ট্রেট শুটারজ’
যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় ইরানের প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। দুই দশক ধরে তারা বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়ে যে শিক্ষা পেয়েছে, সেটিকে পুঁজি করে পরিকল্পনা সাজিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিজেও সে কথা স্বীকার করেছেন।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা জানে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পৌঁছাবে না। সেক্ষেত্রে মার্কিন ভোটারদেরকে যুদ্ধের উত্তাপ বোঝানোর দুটি কার্যকরী উপায় হলো- সেনা হতাহত ও করদাতার পকেটে চাপ সৃষ্টি করা। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে যিনিই থাকুন না কেন, ভোটারদের খ্যাপানো গেলে সেটির চাপ হোয়াইট হাউসে পড়বেই।
চলতি বছরের যুদ্ধ ঠিক এ কৌশলেই এগিয়েছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব আরব দেশ, এমনকি বাইরের কয়েকটি দেশেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপ বাড়ে। গত এপ্রিলে ট্রাম্প যৌথ অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর ইরান লক্ষ্যবস্তু বানায় সৌদি আরবকে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ২৬টি ঘাঁটি অথবা সরঞ্জাম রাখার স্থাপনা লক্ষ্য করে ১১৫টি হামলা চালিয়েছে তেহরান। ধারাবাহিক এই হামলার মুখে ইরান সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপকরণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় পেন্টাগন।
ইরানের হামলায় মার্কিন সেনারাও হতাহত হয়েছেন। অক্টোবরের শেষ নাগাদ যুদ্ধসংশ্লিষ্ট অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ সেনা নিহত এবং ৮৬৫ জন আহত হয়েছেন। এই ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন জনমতে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান নিশ্চিতভাবেই সফল হয়েছে।
তারা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিকে সংকটের কেন্দ্রে পরিণত করে। গত আট মাস ধরে এটি বন্ধ আছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। সেখানে অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়।
ইরান ঠিক এটাই চেয়েছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত করে। সফলও হয়েছে।
নির্বাচনের দিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) চালানো জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে ভুল সিদ্ধান্ত বলেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভোটের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির জন্য ইরান যুদ্ধের পরিণতিকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তেহরান এবারও আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে তাদের দাবিগুলোকে শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে যা হয়েছে
আরব মিত্র দেশগুলো ব্যাপক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত ছিল। জ্বালানির দাম বাড়লেও তা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে ওঠেনি।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা আঘাত সত্ত্বেও ইসরায়েলি জনমনে যুদ্ধের সমর্থন কমেনি। যুদ্ধের এক মাস পর ইহুদিদের তিন-চতুর্থাংশের বেশি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। কয়েক মাসের বিরতির পর এখন প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার মনে করেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে জড়ানো উচিত। প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার আগাম হামলার পক্ষে।
এছাড়া, নতুন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকা নেতারাও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। তারা তেহরানকে ইসরায়েলের প্রধান হুমকি হিসেবে দেখেন। ইসরায়েলি এই জনমত ইরানের জন্য খারাপ খবর। তবে তারা মার্কিন জনমতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে পারে। সেক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারে হরমুজ প্রণালিকে।
তেল আবিবের অনমনীয় অবস্থানের কারণে প্রণালির সংকট সমাধান হচ্ছে না- এই বার্তা যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে ইসরায়েলের অভিযান বন্ধে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়বে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিনি সম্ভবত রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির পরিস্থিতি ডেকে আনতে চাইবেন না।
ওয়াইএফ/০১