জাতীয়



দেশদর্পণ ডেস্ক

অগাস্ট / ৩০ / ২০২৬


নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ


12

Shares


গুম হওয়ার ৬১ দিন পর ভারতের শিলংয়ে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে গিয়ে ক্যামেরার সামনে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’ সেই মুহূর্তের স্মৃতি আজও ভোলেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ ৬১ দিন তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখার পর চোখ বেঁধে শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাড়া পাওয়ার পর তাকে প্রথমে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করা হয়। পরে পুলিশের মাধ্যমে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুম অবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হতো, তিনি পরের ভোরটি দেখতে পারবেন কি না। দিনের আলো দেখার সুযোগ না থাকায় নাশতা এলে বুঝতেন সকাল হয়েছে। নখের আঁচড় দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে দিন গুনতেন।


কবরের মতো কক্ষে কাটে দিন

গুমকারীরা তাকে প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি সংকীর্ণ স্থানে রাখতো বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জায়গাটি ছিল অনেকটা কবরের মতো। সেখানে একটি পানির কল এবং প্রস্রাব-পায়খানার জন্য একটি ছিদ্র ছিল। দুর্গন্ধের পাশাপাশি সেখানে বিষাক্ত পোকামাকড়ও দেখা যেতো।

মেঝেতে একটি কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো এবং পাতলা একটি বালিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়মিত দেওয়া হলেও অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকের সহায়তা পাওয়া যেতো না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুমকারীদের তিনি নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে বলতেন, ‘আমার হার্টে স্টেন্টিং আছে, অন্যান্য জটিলতা আছে, কিডনিতে জটিলতা আছে। এই পরিবেশে কতক্ষণ টিকে থাকবো জানি না। আমার মৃত্যু হলে তোমরা আমার লাশটা আমার পরিবারের কাছে ফেরত দিও।’


অসুস্থ হলেও চিকিৎসা মেলেনি

একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাবার দিতে এসে তার সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা খোলা হয়। পরে গামছা ফেলে তাকে টেনে তোলা হয়। তখন বুকের তীব্র ব্যথার কথা জানালে তাকে বলা হয়, এখানে চিকিৎসক আসা নিষেধ। নিজে নিজে সুস্থ থাকার চেষ্টা করেন।

এর কিছুদিন পর তাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন সকালে পানি কম খেতে বলা হয়েছিল। তখন তার মনে হয়েছিল, হয়তো আজকেই শেষ।


চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তাকে মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা হয়। এরপর হাত বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়িতে আরও কয়েকজন মানুষ ছিল বলে তিনি ধারণা করেন।

কয়েক ঘণ্টা যাত্রার পর একটি স্থানে দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। পরে তাকে কিছুটা হাঁটিয়ে একটি জিপের মতো গাড়িতে তোলা হয়। এরপর আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটি উঁচু জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মানুষের হিন্দিতে কথা বলার শব্দ শুনে তিনি নিশ্চিত হন যে তাকে ভারতের কোনো এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।


নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ইউ আর ফ্রি নাউ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আরও কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে যাওয়ার পর ভোরের দিকে তার চোখ খুলে দেওয়া হয়। তখন তিনি একটি চৌরাস্তা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ও বড় একটি মাঠ দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে ঘুরে তিনি জানতে পারেন, সেটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা। তাকে নির্জন একটি এলাকায় ফুটপাতে নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ইউ আর ফ্রি নাউ।

তখন তার পা ফুলে যাওয়ায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। আশপাশের পথচারীদের কাছে সাহায্য চান তিনি। কিন্তু তার দাড়ি, ময়লা পোশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে অনেকে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করেছিলেন বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।


পুলিশও প্রথমে বিশ্বাস করেনি

পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তাকে একটি বিট হাউসে নেওয়া হয়। সেখানেও নিজের পরিচয় দেওয়ার পর প্রথমে তাকে বিশ্বাস করা হয়নি বলে জানান তিনি। এরপর তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে নর্থ ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সায়েন্সেসে (মিমহানস) নেওয়া হয়।

সেখানে একজন চিকিৎসকের কাছে নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশের পরিবারের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ করেন তিনি। চিকিৎসককে তিনি বলেন, ‘তুমি যদি একটু আমার এখানে টেলিফোন করো, আমি কে বুঝতে পারবা। আমাকে একটু সেন্ড ব্যাক করার ব্যবস্থা করো।’


স্ত্রীর ফোনে পরিচয় নিশ্চিত

একপর্যায়ে তার দেওয়া নম্বরে বাংলাদেশে ফোন করার চেষ্টা করা হয়। তার স্ত্রী তখন বাইরে থাকায় প্রথমে ফোনটি ধরতে পারেননি। পরে বিদেশি নম্বর দেখে তিনি কলব্যাক করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ফোনে নিজের পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রী চিৎকার করে বলেন, ‘আমি জান্নাত পেয়ে গেছি।’ ওই মুহূর্তটি জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা বলে উল্লেখ করেন তিনি।


ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন

পরে তাকে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকের মাধ্যমে তার মানসিক সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় বলে জানান তিনি। পুলিশের কঠোর নজরদারির মধ্যেও কোনো একটি ভারতীয় টেলিভিশন ক্যামেরা দূর থেকে তাকে ধারণ করে। সেখানে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য তিনি বলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’ পরে ওই ভিডিও বাংলাদেশে প্রচারিত হয়।

এরপর তাকে ভারতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর আদালতে আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পথ তৈরি হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরতে পারার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদান রয়েছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা দীর্ঘ ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন, বাংলাদেশটাকে মুক্ত করেছেন। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছেন।


ওয়াইএফ/০১

জাতীয়