68
Sharesছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে শিক্ষক আর গণ রাজনীতির ময়দানে নেমেই হয়েছিলেন পৌরসভার চেয়ারম্যান। তৃণমূল থেকে উঠে আসা সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ— রাষ্ট্রপতির আসনে মনোনয়ন দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। শিক্ষকতা ছেড়ে নির্দলীয়ভাবে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি থেকে দলের মহাসচিব। সংসদ সদস্য থেকে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে এখন বসতে যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির আসনে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেন দলটির নেতারা। সর্বমহলে ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা। বিএনপির প্রবীণ নেতারা মনে করেন, মির্জা ফখরুল দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলে রেখেছেন, দলের পতাকা উড্ডীন রেখেছেন তা নজিরবিহীন।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। অনেক বছর আগে সরকারি চাকরির সুনিশ্চিত জীবন ছেড়ে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার লক্ষ্য নিয়ে রাজপথকে বেছে নিয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ।
ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী ছাত্র। জন্মস্থান ঠাকুরগাঁও থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাবিতে অধ্যয়নকালে তিনি বাম ধারার রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি এবং এস এম হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষকতায়। কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের অধিকার ও রাজপথের রাজনীতি তাঁকে বরাবরই টানত। সেই তাগিদ থেকেই ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সেই থেকে শুরু বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিক্রমা।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। হয়েছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রীও।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পট পরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। অপরদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। এজন্য তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে লম্বা সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দৃশ্যমান নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে খালেদা জিয়ার সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁওসহ দুই আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ করেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা। ২০২৫ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে এক সুখী পরিবারের প্রধান মির্জা ফখরুল। তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়া নিবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। অন্যদিকে ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
এমএএম-০১/ওয়াইএফ-০১