খেলাধুলা



রাফিদ চৌধুরী

জুলাই / ০৬ / ২০২৬


ব্রাজিলের একটি পেনাল্টি মিস, আর এগারো মিনিটে নরওয়ের ইতিহাস


67

Shares

কিছু হার আসে ধীরে, ম্যাচের শুরু থেকেই যার আভাস পাওয়া যায়। আর কিছু হার আসে বজ্রপাতের মতো। শেষ কয়েখ মিনিটে, যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে বলেই মনে হয়। নিউ জার্সিতে রবিবার ভোর রাতে ব্রাজিলের ভাগ্যে জুটল দ্বিতীয়টাই। ৩৬ বছর আগে ইতালিতে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। আর সেই বিদায়টা লিখে দিলেন পঁচিশ বছর বয়সী এক নরওয়েজিয়ান, আর্লিং হালান্ড।

শুরুতেই একটা মুহূর্ত এসেছিল, যা ম্যাচের পুরো গল্পটাই বদলে দিতে পারত। চৌদ্দ মিনিটে পেনাল্টি পেল ব্রাজিল। মাঠের সবচেয়ে বিপজ্জনক নাম ভিনিসিউস জুনিয়র সেই মুহূর্তে বলটা তুলে দিলেন ব্রুনো গিমারেসের হাতে এমন একজনের হাতে, যিনি নিজের পুরো ক্যারিয়ারে মাত্র তিনটে পেনাল্টি নিয়েছেন, আর ব্রাজিলের জার্সিতে এই প্রথম।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি জানালেন, এটা পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া সিদ্ধান্ত, কোচিং স্টাফের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। যুক্তিটা কাগজে-কলমে মন্দ নয় ভিনিসিউসের নিজের পেনাল্টি-রেকর্ডও তেমন ভরসাযোগ্য নয়। কিন্তু ফুটবল তো শুধু কাগজে-কলমে চলে না।

নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড সঠিক দিকে ঝাঁপালেন, বলটা ঠেকিয়ে দিলেন, আর সেই এক মুহূর্তেই যেন ভেঙে পড়ল ব্রাজিলের চার দশকের এক নীরব গর্ব ১৯৮৬ সালে জিকোর মিসের পর থেকে বিশ্বকাপে তাদের প্রতিটি পেনাল্টি জালে জড়িয়েছিল, টানা চল্লিশ বছর। ভোরে সেই ধারাবাহিকতাও থেমে গেল, ঠিক তখনই, যখন থামাটা সবচেয়ে বেশি ব্যথা দেয়।

এরপর ম্যাচটা যেন নিজের ছন্দ হারিয়ে ফেলল ব্রাজিলের জন্য। মাঠ জুড়ে বল দখলে রাখল নরওয়ে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় বলটা ছিল তাদেরই পায়ে সাতষট্টি শতাংশের কাছাকাছি, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পায়ে মোটে তেত্রিশ। এমন এক রাতে, যেখানে নিজেদের চেনা উঁচু-চাপের প্রেসিং আর পজেশন-ফুটবল প্রতিষ্ঠাই করতে পারল না সেলেসাওরা।

লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতিতে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে মিডফিল্ডে নামানোর সিদ্ধান্তটাও যেন উল্টো ফল দিল। উইঙ্গার মার্তিনেল্লি মাঝমাঠের সৃজনশীলতার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারলেন না, আর সেই শূন্যতাতেই মাঠ জুড়ে অসংগঠিত, সমতল দেখাতে লাগল পুরো ব্রাজিল।

তারপর এলো সেই এগারো মিনিট, যা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে নরওয়েজিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে। ৭৯ মিনিটে হালান্ড লাফালেন, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস পাঁচ গজ পেছনে রইলেন। যেন ভুলেই গিয়েছিলেন প্রতিদিন আর্সেনালের অনুশীলনে এই মানুষটার সাথেই তার লড়াই হয়। স্কেলদেরুপের ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে হালান্ড এগিয়ে দিলেন নরওয়েকে। গ্যারি নেভিল পরে বললেন, তিনি ক্ষুব্ধ, রীতিমতো ক্ষুব্ধ কারণ গ্যাব্রিয়েলের জানা উচিত ছিল, হালান্ডকে একবার দৌড়াতে দিলে তুমি শেষ। নব্বই মিনিটে আরেকটা আঘাত বক্সের বাইরে থেকে নিচু, তীব্র এক শট, যা জালের কোণ খুঁজে নিল নিখুঁত নিশানায়। ব্যবধান তখন ২-০।

বদলি হিসেবে নামা এন্ড্রিক একটা সুযোগ পেয়েছিলেন, একেবারে গোলরক্ষকের মুখোমুখি কিন্তু নিল্যান্ড এগিয়ে এসে সেই আশাটুকুও প্রায় কেড়ে নিলেন। আর নেইমার, যিনি এই টুর্নামেন্টে মাত্র দ্বিতীয়বার মাঠে নেমেছেন, স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষদিকে পেনাল্টি থেকে একটা গোল শোধ করলেন হয়তো জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ স্পর্শ, চোখে জল নিয়ে যিনি মাঠ ছাড়লেন কিছুক্ষণ পরেই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্যবধান কমল ঠিকই, ইতিহাস বদলাল না।

নরওয়ে যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার উৎসবে মাতোয়ারা, ঠিক তখন নিউ জার্সির গ্যালারিতে হলুদ জার্সিরা নিঃশব্দ। কোচ স্তালে সোলবাকেন বলবেন, এটা নরওয়েজিয়ান ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাত। হালান্ড বলবেন, তিনি বহুবার নিজের সীমা ছুঁয়েছেন এই টুর্নামেন্টে, কিন্তু আজকের রাতটা তার মধ্যে সবচেয়ে উঁচু চূড়া।

আর ব্রাজিলের জন্য? এই হার নিছক একটা ম্যাচ হারানো নয়। ২০০২ সালে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম শিরোপা জেতার পর থেকে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের নকআউটে একটিও জয় নেই তাদের টানা ছয়টি টুর্নামেন্টে ইউরোপের কাছে বিদায়, যার সবশেষ সংযোজন আজকের এই নরওয়ে।

এটা কোনো একজন কোচের ব্যর্থতা নয়, এটা একটা প্রজন্মের কাঠামোগত সংকট, যা আনচেলত্তির মতো একজন কিংবদন্তি কোচও একা এসে সারিয়ে দিতে পারেননি। তার চুক্তি ২০৩০ পর্যন্ত টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতিতে ফলাফলের চাপ সবসময়ই কাগজের চুক্তির চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে।

চব্বিশ বছরের শিরোপাখরা নিয়ে এই বিশ্বকাপে এসেছিল ব্রাজিল, স্বপ্ন ছিল সেই খরা ভাঙার। নিউ জার্সির এই বিকেল সেই খরাকে আরও অন্তত চার বছর দীর্ঘ করে দিল। ভিনিসিউস মাঠে শুয়ে পড়েছিলেন খেলা শেষ হওয়ার পর, নেইমার চোখ মুছতে মুছতে হাঁটছিলেন সুড়ঙ্গের দিকে আর হালান্ড, ততক্ষণে ড্রাম বাজিয়ে উদযাপনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিজের সতীর্থদের সঙ্গে।

প্রতিভা থাকলেই যথেষ্ট হয় না, ফুটবল রবিবার ভোর রাতে আবার সেই পুরনো, নিষ্ঠুর পাঠটাই মনে করিয়ে দিল ব্রাজিলকে। দরকার হয় কাঠামো, পরিকল্পনা, আর চাপের মুহূর্তে সঠিক একটা সিদ্ধান্ত। তিনটির একটিও ছিল না তাদের কাছে, ঠিক যেদিন সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল।

খেলাধুলা